বিতস্তা সেন। কলকাতা সারাদিন।
ভারতের শহুরে সমাজ দ্রুত বদলাচ্ছে। সম্পর্কের সংজ্ঞা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা এবং বিবাহিত জীবনের কাঠামো—সবই নতুন আলোচনার কেন্দ্রে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মেট্রো শহরের পাশাপাশি কলকাতা, দুর্গাপুর, আসানসোল, শিলিগুড়ির মতো দ্বিতীয় সারির শহরেও ‘সুইংিং’ বা পারস্পরিক সম্মতিতে সঙ্গী বদলের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। সংখ্যাটা কত, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই, তবে সামাজিক মাধ্যমে গড়ে ওঠা একাধিক গোপন গোষ্ঠী ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই জীবনধারা আর একেবারে প্রান্তিক নয়।
ভারতের শহুরে সমাজ দ্রুত বদলাচ্ছে। সম্পর্কের সংজ্ঞা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা এবং বিবাহিত জীবনের কাঠামো—সবই নতুন আলোচনার কেন্দ্রে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মেট্রো শহরের পাশাপাশি কলকাতা, দুর্গাপুর, আসানসোল, শিলিগুড়ির মতো দ্বিতীয় সারির শহরেও ‘সুইংিং’ বা পারস্পরিক সম্মতিতে সঙ্গী বদলের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। সংখ্যাটা কত, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই, তবে সামাজিক মাধ্যমে গড়ে ওঠা একাধিক গোপন গোষ্ঠী ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই জীবনধারা আর একেবারে প্রান্তিক নয়।
এই প্রবণতাকে অনেকেই ‘লাইফস্টাইল চয়েস’ হিসেবে দেখছেন। অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য, এটি প্রতারণা নয়, কারণ সব কিছুই ঘটে পারস্পরিক সম্মতিতে। একাধিক দম্পতির দাবি, তাঁদের কাছে এটি কৌতূহল মেটানো বা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের উপায়, যেখানে সম্পর্কের ভাঙন নয় বরং ‘স্বচ্ছতা’কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেউ কেউ বলেন, একসঙ্গে সময় কাটানো, আড্ডা, ভ্রমণ—এসবের মাধ্যমেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, শারীরিক দিকটি একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু নয়।
তবে সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, বিষয়টি এত সরল নয়। কলকাতার এক সমাজবিজ্ঞানীর বক্তব্য, বিশ্বায়ন, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের প্রসার—এই তিনটি বড় কারণ। কর্মব্যস্ত নগরজীবনে একঘেয়েমি কাটাতে অনেকেই নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজ করেন। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, সামাজিক স্বীকৃতি আর সামাজিক নিরাপত্তা এক জিনিস নয়।
মনোবিদদের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের দাম্পত্যে যোগাযোগের ঘাটতি, আত্মসম্মানের সমস্যা বা অপ্রকাশিত মানসিক চাপ অনেক সময় এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে উভয়েই সমান আগ্রহী। কিন্তু যেখানে এক পক্ষের উপর চাপ থাকে, সেখানে তা মানসিক আঘাতের কারণ হতে পারে। সম্মতির প্রশ্নটি এখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল। সম্পর্কের ভিত মজবুত না হলে এই পরীক্ষা উল্টে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি ধূসর। ভারতে প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আইনত অপরাধ নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন গোপন ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের হুমকি, ব্ল্যাকমেল বা প্রতারণা জড়িয়ে পড়ে। সাইবার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সামাজিক মাধ্যমে ছদ্মনাম ব্যবহার করলেও ডিজিটাল ট্রেইল থেকে যায়। ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ফাঁস হয়ে গেলে তার সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, দাম্পত্যে ভাঙন দেখা দিলে এই ধরনের জীবনযাপন পরবর্তীকালে বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কে সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ নেই, তবুও প্রতারণা, জোরজবরদস্তি বা আর্থিক শোষণের অভিযোগ উঠলে ফৌজদারি মামলা হতে পারে। ফলে ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ আর ‘আইনি জটিলতা’—দুটির মধ্যে সূক্ষ্ম সীমারেখা রয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার এক আধিকারিক জানালেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচয় গড়ে তুলে প্রতারণার ঘটনা বেড়েছে। প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে ব্যক্তিগত তথ্য আদানপ্রদান—তারপর শুরু ব্ল্যাকমেল। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জার ভয়ে অভিযোগ করতে চান না।
সমাজের একাংশ এই প্রবণতাকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখলেও, অন্য অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করছে পারিবারিক কাঠামোর উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে। বিশেষ করে ছোট শহরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সামাজিক প্রতিক্রিয়া তীব্র হতে পারে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণকারীরা গোপনীয়তাকেই প্রধান ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, বিষয়টি কেবল ‘রোমাঞ্চ’ বা ‘চটকদার শিরোনাম’-এর সীমায় আটকে নেই। এটি আধুনিক ভারতীয় সমাজের পরিবর্তিত মনস্তত্ত্ব, প্রযুক্তির প্রভাব এবং আইনি কাঠামোর নতুন পরীক্ষার ক্ষেত্র। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সম্মতি, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধও সমান জরুরি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—এই পরিবর্তন কি সাময়িক প্রবণতা, নাকি সম্পর্কের সংজ্ঞায় স্থায়ী রূপান্তরের ইঙ্গিত? উত্তর সময়ই দেবে। তবে সতর্কতা, সচেতনতা এবং আইনি বোঝাপড়া ছাড়া যে কোনও ‘লাইফস্টাইল এক্সপেরিমেন্ট’ বিপদের কারণ হতে পারে—এ কথা বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে স্বীকার করছেন।