সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
পূর্ব বর্ধমানের পরে এবারে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার। বাংলার ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে অস্বাভাবিক কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হলেন আরও এক বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও। মালবাজারে ভোটার তালিকা সংশোধনীর কাজের চাপে এক বিএলও-র আত্মহত্যার ঘটনা ঘিরে ফের তোলপাড় শুরু হল বাংলার রাজ্য রাজনীতিতে।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে কাজের চাপে বিএলও শান্তি মুনি ওরাওঁ আত্মঘাতী হয়েছেন বলে তাঁর পরিবারের অভিযোগ। এই নিয়ে কেন্দ্রের মোদি সরকার এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরই এই নিয়ে তৎপর হল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। জলপাইগুড়ির জেলাশাসক তথা ডিইও-র কাছ থেকে রিপোর্ট তলব করল। মালবাজারের ওই বুথ লেভেল অফিসারের কী কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে দ্রুত রিপোর্ট পাঠাতে জলপাইগুড়ির জেলাশাসককে চিঠি লিখলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল।
প্রসঙ্গত, গত ৯ নভেম্বর পূর্ব বর্ধমানে ব্রেন স্ট্রোক হয়ে মৃত্যু হয় বিএলও নমিতা হাঁসদার। তিনি মেমারির চক বলরামপুরের ২৭৮ নম্বর বুথের বিএলও হিসাবে কাজ করছিলেন। অসুস্থ হলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরিবারের দাবি ছিল, রাতদিন এক করে কাজ করতে হচ্ছিল নমিতাকে। কাজের চাপেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
বাংলায় এসআইআর শুরুর পর থেকে ২৮ মৃত্যু
রাজ্যজুড়ে জোরকদমে চলছে এসআইআর প্রক্রিয়া। তারপর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আত্মহত্যার অভিযোগ উঠে এসেছে। একের পর এক মৃত্যুতে গর্জে উঠলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার সকালে এক্স হ্যান্ডলে কমিশনকে আক্রমণ করলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। ‘আমি নির্বাচন কমিশনকে ন্যায়সঙ্গত ভাবে কাজ করার কথা বলব এবং আরও প্রাণহানির আগে অবিলম্বে এই অপরিকল্পিত অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’ উল্লেখ্য, এর আগেও রাজ্যের শাসকদলের তরফে এসআইআর-এর বিরোধিতা করে জানানো হয়েছিল, এক-দুই মাসের মধ্যে গোটা প্রক্রিয়া কী করে সম্পন্ন করা সম্ভব? ২০০২ সালে প্রায় এক থেকে দেড় বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর কাজ হয়েছিল, সেখানে একমাসের মধ্যেই দ্রুততার সঙ্গে ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী আদৌ সম্ভব? প্রশ্ন তোলে তৃণমূল।
ইতিমধ্যেই এসআইআর-এর ‘আতঙ্কে’ রাজ্যে একাধিক ভোটারের মৃত্যু হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘এসআইআর শুরু হওয়ার পর থেকে রাজ্যে ২৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেউ আতঙ্কিত হয়ে, কেউ দুশ্চিন্তার কারণে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন। কমিশনের অপরিকল্পিত ও অবিরাম কাজের চাপের কারণে মূল্যবান জীবন চলে যাচ্ছে। আগে যে প্রক্রিয়া ৩ বছর সময় লাগত, এখন রাজনৈতিক প্রভুদের খুশি করার জন্য নির্বাচনের আগে মাত্র ২ মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বিএলওদের উপর অমানবিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।’
কি অভিযোগ পরিবারের
মালবাজারের রাঙামাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা শান্তি আইসিডিএস কর্মী ছিলেন। পাশাপাশি সামলাচ্ছিলেন ১০১ নম্বর বুথে বিএলও-র দায়িত্ব। মৃতা শান্তি মুনি ওরাওঁ (৪৮)-র পরিবারের অভিযোগ, বিএলও-র কাজের অতিরিক্ত চাপ ও মানসিক বিপর্যয়ের জেরেই ঘটেছে এই মর্মান্তিক ঘটনা। প্রতিদিন ভোর থেকেই কাজ শুরু করতেন তিনি। কিন্তু বুধবার সকালে সন্দেহ হয় স্বামী সুখু এক্কার—রান্না হয়নি, স্ত্রীও বাড়িতে নেই। কিছু দূরে গিয়েই তাঁকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান তিনি।

সুখুর কথায়, বাংলা পড়তে-লিখতে না জানায় রোজই বাড়ত কাজের সমস্যা। কয়েক দিন আগে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে ব্লকের যুগ্ম বিডিও-র কাছে আবেদন করেছিলেন শান্তি। কিন্তু তাঁকে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয় বলে দাবি তাঁর পরিবারের। সকাল ১১টা থেকে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত টানা কাজ—এসবই ক্রমশ সামলানো কঠিন হয়ে উঠছিল।
ছেলে ডিসুজা এক্কার কথায়, ‘আমরা কেউ বাংলা জানি না। মা সাহায্য চাইলে পারতাম না। ওঁকে প্রায়ই চাপের কথা বলতে শুনতাম।’
খবর পেয়ে মৃতার বাড়িতে যান রাজ্যের আদিবাসী কল্যাণমন্ত্রী বুলুচিক বরাইক। তাঁর বক্তব্য, ‘এসআইআর আতঙ্কে বহু ভোটার এবং কর্মী বিপদের মুখে পড়ছেন। এবার কাজের অতিরিক্ত চাপ এক বিএলও-র জীবন কেড়ে নিল। ওঁরা হিন্দিভাষী হওয়ায় কাজ আরও কঠিন ছিল। এর দায় নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।’