সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘তৃণমূলকে বাঁচানোর মতো আর কেউ বেঁচে নেই। মা, মাটি, মানুষের স্লোগান তুলে ক্ষমতায় এসেছিল। এখন বাংলায় মায়েরা কাঁদছে, মাটি লুঠ করছে, আর মানুষ বাংলা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। বাংলার রুটি, বেটি, মাটি এখন ঝুঁকির মুখে। তৃণমূলের গুন্ডাগিরির দিন শেষ। সবকা সাথ সবকা বিকাশের সঙ্গে সবার হিসেবও করবে বিজেপি। অনুপ্রবেশকারী বিজেপি সরকারকে ভয় পাবে। অপরাধীরা শুধু জেলে থাকবে।’ এভাবেই শনিবারের বারবেলায় ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসমাবেশ থেকে রাজ্যের শাসক দলকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর অভিযোগ, বাংলার মানুষ একসময় বাম আমলে অপহরণ ও হত্যার রাজনীতি দেখেছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির আশায় মানুষ পরিবর্তনের ডাক দিয়ে ভরসা রেখেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের উপর। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি বলেই দাবি করেন তিনি।
মোদীর বক্তব্য, বাম আমলের গুন্ডাদেরই এখন দলে টেনে নিয়েছে তৃণমূল। ফলে বাংলায় দুষ্কৃতীদের অবাধ দাপট চলছে বলে অভিযোগ তাঁর। নারী ও শিশুদের উপর অত্যাচারের ঘটনা বাড়ছে বলেও দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। রাজ্যে যে কোনও বড় অপরাধের ঘটনায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নাম জড়িয়ে যাচ্ছে ঠিক এমনই অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সন্দেশখালির ঘটনা কিংবা আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এক পড়ুয়ার উপর নৃশংস ঘটনার কথা মানুষ এখনও ভুলে যায়নি। অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে সরব হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তৃণমূল মাফিয়াদের পোষে, কট্টরপন্থীদের আড়াল করে। অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকায়। বাংলার মাটি দখল করে নিচ্ছে অনুপ্রবেশকারীরা। বাংলার অধিকাংশ এলাকায় জনবিন্যাস বদলে গিয়েছে। হিন্দুরাই সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছেন। শরণার্থী হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করে তৃণমূল। যে শরণার্থীরা বাংলার বিভাজনের পক্ষে ছিল না। যাঁরা অবিভক্ত বাংলা, ভারতকে নিজেদের মাতৃভূমি ভেবেছিল। তৃণমূল তাঁদেরই নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধে। কারণ ওদের জন্য অনুপ্রবেশকারীরাই ভোট ব্যাঙ্ক।’
রাজ্যের কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বাংলার যুব সমাজ আজ কাজের খোঁজে রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে। একসময় যে বাংলা গোটা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে, সেই বাংলাতেই আজ তরুণদের হাতে নেই পর্যাপ্ত সুযোগ, না মিলছে ডিগ্রি, না মিলছে চাকরি। তৃণমূলের এসআইআর বিরোধিতার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই কারণেই তৃণমূল এসআইআর-এর বিরোধিতা করে। যাতে এই অনুপ্রবেশকারীদের নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিতে চায় না। ভোটার লিস্ট শুদ্ধ না হয়ে যায়। এরা মৃত মানুষদেরও নাম মোছার বিপক্ষে। জনবিন্যাসের ভয়ঙ্কর বদল বাংলাকে আজ বাংলাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এখন তো প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে। বলছে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের লোক আপনাদের শেষ করে দেবে। সাংবিধানিক পদে বসে এমন হুমকি, কোটি কোটি বাঙালিকে শেষ করার কথা আপনার মুখে শোভা পায় না। আমি জানতে চাই, কারা তৃণমূল সরকারের ইশারায় কোটি কোটি মানুষকে শেষ করে দেবে? হুমকি, ধমকের এই রাজনীতিকে তৃণমূল নিজেদের অস্ত্র করে নিয়েছে। বাংলায় তৃণমূল কেমন ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে, গোটা দেশের জানা উচিত।’
একইসঙ্গে তিনি কংগ্রেস, সিপিএম ও তৃণমূল এই তিন রাজনৈতিক শক্তিকেই একসঙ্গে আক্রমণ করেন। মোদীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই দলগুলি ক্ষমতায় থেকে নিজেদের স্বার্থই দেখেছে। ফলে বাংলার উন্নয়ন থমকে গেছে, বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্পের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি চাকরি নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন তিনি।

সভায় যোগ দিতে আসা কর্মী সমর্থকদের বাধা দেওয়ার অভিযোগও তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিভিন্ন সেতু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে,পাশাপাশি বিজেপির পতাকা নামিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। তবে এত কিছুর পরেও জনসমাগম আটকানো যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভাষণের শেষে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী সুর শোনা যায় প্রধানমন্ত্রীর গলায়। তাঁর কথায়, যে বাংলা একসময় গোটা দেশকে পথ দেখিয়েছে, সেই বাংলাই আবার উন্নয়নের নতুন দিশা দেখাবে। তাঁর বিশ্বাস, খুব শীঘ্রই রাজ্য আবার বিকশিত বাংলার পথে এগিয়ে যাবে।