নির্বাচন কমিশনের SIR বৈধ বলেই জানাল শীর্ষ আদালত, তবে নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষমতা কমিশনের নেই—রায়ে নতুন রাজনৈতিক ঝড়
শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক, রাজনৈতিক চাপানউতোর আর নাগরিকত্ব আতঙ্কের মাঝেই অবশেষে বড় রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট।
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়া নিয়ে ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল—ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেই কেউ “অ-নাগরিক” হয়ে যান না!
এই রায় সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো রাজ্যে, যেখানে SIR নিয়ে গত এক বছর ধরে উত্তেজনা তুঙ্গে ছিল, সেখানে এই পর্যবেক্ষণকে ঘিরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
বুধবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, নির্বাচন কমিশনের SIR চালানোর সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।
সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন করতেই পারে।
তবে একইসঙ্গে আদালত বড় সীমারেখাও টেনে দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের কাজ শুধুমাত্র ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কে ভারতের নাগরিক আর কে নন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের হাতে নেই।
অর্থাৎ, কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলেই তাঁকে “অনুপ্রবেশকারী” বা “নাগরিক নন” বলে ঘোষণা করা যাবে না—এই বার্তাই কার্যত দিয়ে দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
গত বছর বিহার বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রথম বড় আকারে SIR প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ একাধিক রাজ্যেও এই প্রক্রিয়া চালানো হয়।
সেই সময় থেকেই বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
একের পর এক মামলা পৌঁছয় সুপ্রিম কোর্টে। প্রশ্ন ওঠে—নির্বাচন কমিশন কি আদৌ নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে?
এই মামলার শুনানিতে কমিশনের তরফে দাবি করা হয়েছিল, শুধুমাত্র ভারতীয় নাগরিকরাই ভোটার হতে পারেন। তাই ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় নাগরিকত্ব যাচাই প্রয়োজন।
কিন্তু আবেদনকারীদের আইনজীবীরা পাল্টা যুক্তি দেন, নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্য আলাদা মন্ত্রক ও আইনি কাঠামো রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সেই ভূমিকা নিতে পারে না।
আজকের রায়ে আদালত কার্যত দুই পক্ষের মধ্যেই ভারসাম্য রাখল।
আদালত জানিয়েছে, কমিশন চাইলে ভোটার তালিকায় নাম রাখার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি চাইতে পারে। কোন নথি গ্রহণযোগ্য হবে, সেটাও কমিশন ঠিক করতে পারে।
কিন্তু কোনও ব্যক্তির নাম বাদ গেলে তাঁর নাগরিকত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় সরকার।
শীর্ষ আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁদের তথ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বা বিদেশমন্ত্রকে পাঠাতে হবে। চার সপ্তাহের মধ্যে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে কমিশনকে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কেন্দ্রকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই ফাইল ঝুলিয়ে রাখারও সুযোগ দেয়নি আদালত।
পরবর্তী লোকসভা বা সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
কারণ আদালতের মতে, এই বিষয়ের সঙ্গে শুধু ভোটাধিকার নয়, জড়িয়ে রয়েছে সরকারি প্রকল্প, ভাতা এবং একাধিক সামাজিক সুবিধার প্রশ্নও।
রায় প্রকাশের পরেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।
তৃণমূল সাংসদ ও আইনজীবী Kalyan Banerjee বলেন, “যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদের অনুপ্রবেশকারী বলা যাবে না—সুপ্রিম কোর্ট কার্যত সেটাই স্পষ্ট করে দিয়েছে।”
অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই রায় একদিকে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে বৈধতা দিলেও, অন্যদিকে নাগরিকত্ব ইস্যুতে কেন্দ্রের উপরই বড় দায় চাপিয়ে দিল।

বিশেষ করে বাংলায় আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই রায় যে নতুন করে রাজনৈতিক তাপমাত্রা বাড়াবে, তা বলাই যায়।
কারণ ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব আর “অনুপ্রবেশ” ইস্যু—এই তিনটি বিষয় এখন সরাসরি নির্বাচনী ময়দানের কেন্দ্রে।
এখন বড় প্রশ্ন একটাই—যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে কে? আর সেই সিদ্ধান্তঘিরেই কি শুরু হতে চলেছে নতুন রাজনৈতিক লড়াই?