ইস্পাত সরিয়ে বসানো হল অ্যালুমিনিয়াম থার্ড রেল, বিদ্যুৎ সাশ্রয় থেকে গতি—সবেতেই বড় চমক
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা মেট্রোতে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। শহরের ‘লাইফলাইন’-এ এবার এমন বদল হল, যা গত চার দশকে কখনও দেখা যায়নি। কবি সুভাষ থেকে দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত ব্লু লাইনে সম্পূর্ণ বদলে ফেলা হল পুরনো ইস্পাতের থার্ড রেল। তার জায়গায় বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক অ্যালুমিনিয়াম থার্ড রেল।
মেট্রো কর্তৃপক্ষের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই হবে না, আরও দ্রুত ছুটবে ট্রেন। এমনকি ভবিষ্যতে আড়াই মিনিট অন্তর মেট্রো চালানোর পরিকল্পনাও বাস্তবের কাছাকাছি চলে এল।
প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই বিশাল কাজ অবশেষে সম্পূর্ণ হয়েছে। ধাপে ধাপে রাতের অন্ধকারে চলেছে রেল বদলের কাজ। আর সেই কাজ শেষ হতেই কার্যত নতুন চেহারা পেল কলকাতার সবচেয়ে পুরনো ও ব্যস্ততম মেট্রো করিডর।
মেট্রো সূত্রে জানা গিয়েছে, গোটা উত্তর-দক্ষিণ করিডরে বহু বছরের পুরনো স্টিলের থার্ড রেল সরিয়ে বসানো হয়েছে অ্যালুমিনিয়ামের রেল। প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই বদল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কারণ, অ্যালুমিনিয়ামের বিদ্যুৎ পরিবহণ ক্ষমতা স্টিলের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বিদ্যুতের অপচয় কম হবে, ট্রেন দ্রুত গতি তুলতে পারবে এবং পরিষেবা আরও মসৃণ হবে।
মেট্রো কর্তাদের দাবি, এই বদলের ফলে প্রায় ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের অপচয় কমানো সম্ভব। বছরে প্রায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে বলেও অনুমান।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল, এই সাশ্রয় থেকেই আগামী তিন বছরের মধ্যে পুরো প্রকল্পের খরচ উঠে আসতে পারে।
কীভাবে হল এই বিশাল কাজ?
মেট্রো সূত্রের খবর, পুরো কাজটি একসঙ্গে করা হয়নি। যাত্রী পরিষেবা সচল রেখেই ধাপে ধাপে কাজ এগিয়েছে। প্রথমে মহানায়ক উত্তম কুমার স্টেশন থেকে দমদম পর্যন্ত অংশে কাজ হয়। পরে উত্তম কুমার স্টেশন থেকে কবি সুভাষ পর্যন্ত রেল বদলের কাজ সম্পূর্ণ করা হয়।
প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ মিটার করে রেল বদল করা হয়েছে। স্টিলের রেলের মতো অ্যালুমিনিয়াম জোড়ার জন্য ঝালাইয়ের প্রয়োজন হয়নি। বিশেষ প্লেটের মাধ্যমে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগতভাবে এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন রেল বিশেষজ্ঞরা। কারণ, কলকাতা মেট্রোর ব্লু লাইনই শহরের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত করিডর। প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী এই রুটে যাতায়াত করেন।
তাই এত পুরনো লাইনে এই ধরনের বড় পরিকাঠামোগত বদল কার্যত নজিরবিহীন।
মেট্রো কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা আরও বড়। ভবিষ্যতে মাত্র ১৫০ সেকেন্ড বা আড়াই মিনিট অন্তর ট্রেন চালানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নতুন অ্যালুমিনিয়াম থার্ড রেল সেই পরিকল্পনাকে অনেকটাই এগিয়ে দিল।
কারণ, বিদ্যুতের ভোল্টেজ ড্রপ কম হলে ট্রেন দ্রুত অ্যাক্সেলারেট করতে পারে। ফলে একটির পর একটি ট্রেন দ্রুত চালানো সম্ভব হবে।
এদিকে, কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণের কাজও জোরকদমে এগোচ্ছে। ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো ও জোকা-তারাতলা করিডরে শুরু থেকেই অ্যালুমিনিয়াম থার্ড রেল ব্যবহার করা হয়েছে। এবার সেই আধুনিক প্রযুক্তিই ঢুকে পড়ল শহরের প্রাচীনতম লাইনে।
শুধু তাই নয়, নিউ গড়িয়া থেকে সেক্টর ফাইভ পর্যন্ত অরেঞ্জ লাইনের কাজও দ্রুত এগোচ্ছে। মেট্রো কর্তৃপক্ষের আশা, সব কিছু পরিকল্পনা মতো চললে চলতি বছরের বড়দিনেই সেই পরিষেবা চালু করা সম্ভব হবে।

ইতিমধ্যেই বাইপাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশে এলিভেটেড করিডর জোড়ার কাজও শেষ হয়েছে। চিংড়িঘাটা থেকে গৌরকিশোর ঘোষ স্টেশন পর্যন্ত রেলপথ তৈরির কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে।
সব মিলিয়ে, কলকাতার মেট্রো এখন শুধু পাতাল রেল নয়, প্রযুক্তির দৌড়ে দেশের অন্যতম আধুনিক নগর পরিবহণ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—আড়াই মিনিট অন্তর ট্রেন চলার সেই স্বপ্ন কবে বাস্তবে দেখবে কলকাতা?