সরকার গঠনের পর তৃণমূল নেতাদের বিজেপিতে যোগদানের জল্পনায় জল ঢাললেন শমীক ভট্টাচার্য। বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে একের পর এক কড়া বার্তায় বাড়ালেন রাজনৈতিক উত্তাপ।
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: বাংলার রাজনৈতিক অন্দরে যখন দলবদলের জল্পনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই বিস্ফোরক বার্তা দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা— “তৃণমূলের জন্য বিজেপির দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ।” এই এক বাক্যেই কার্যত থামিয়ে দিলেন তৃণমূলের নেতা, বিধায়ক কিংবা প্রভাবশালী মুখদের বিজেপিতে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে চলা যাবতীয় জল্পনা।
বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তৃণমূলের একাংশ কি এবার নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা খুঁজবে? সেই জল্পনার মাঝেই দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে কড়া অবস্থান জানিয়ে দিলেন শমীক।
তাঁর দাবি, বাংলায় বিজেপির এই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে তৃণমূলের কোনও নেতাকে দলে টানার কৌশল কাজ করেনি। বরং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এবং নিচুতলার সংগঠনের লড়াইই বিজেপিকে ক্ষমতায় পৌঁছে দিয়েছে।
শমীকের কথায়, “আমরা কাউকে আমদানি করে এই জয় পাইনি। তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষ ভোট দিয়েছে। প্রতিটি বিধায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা তৈরি করে মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। সেই জনমতের ফলই আজকের এই ম্যান্ডেট।”
এরপরই আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন বিজেপি সভাপতি। তাঁর অভিযোগ, যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের বিজেপিতে জায়গা দেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই।
“যাঁরা চাকরি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, যাঁরা মানুষের জীবন দুর্বিষহ করেছেন, তাঁদের আমরা দলে নেব কেন? বিজেপির তৃণমূলীকরণ সম্ভব নয়। হবে না, হবে না, হবে না”— জোর দিয়ে বলেন তিনি।
শুধু বিরোধীদের উদ্দেশেই নয়, নিজের দলের কর্মী-নেতাদের প্রতিও কড়া বার্তা দেন শমীক। জেলা নেতৃত্ব এবং তৃণমূল থেকে আসতে ইচ্ছুক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন।
তাঁর বক্তব্য, “দলবদলু তৃণমূলীদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখবেন না। যারা এতদিন অন্য দলে থেকে ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করেছে, তারা এখন নতুন সরকারের আমলেও সেই সুযোগ নিতে চাইছে। বিজেপিতে সেই সংস্কৃতির কোনও জায়গা নেই।”
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিজেপি নতুন সরকারের ভাবমূর্তি পরিষ্কার রাখতে চাইছে। ক্ষমতায় আসার পর দলবদলু নেতাদের ভিড় নিয়ে যে প্রশ্ন উঠতে পারত, শমীকের মন্তব্য তার আগেই একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিল।
তবে এখানেই থামেননি তিনি। বাংলার বর্তমান বিরোধী রাজনীতির অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজেপি সভাপতি। তাঁর আক্ষেপ, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর একটি সরকার গঠন হলেও আজ রাজ্যে কার্যকর এবং দায়িত্বশীল বিরোধী শক্তির অভাব দেখা দিয়েছে।
শমীক বলেন, “একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আজ সেই পরিস্থিতি নেই। আমি বহু মাস আগেই বলেছিলাম, তৃণমূল চলে যাচ্ছে, চলে গেছে, চলে যাবেই।”
তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতীত রাজনৈতিক সংগ্রামকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি তিনি। বরং স্বীকার করেছেন, একসময় সিপিএমের বিরুদ্ধে কঠোর লড়াই করেছিলেন মমতা।
তবে তাঁর দাবি, সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা পরবর্তীকালে বজায় থাকেনি। শাসন ব্যবস্থার নানা ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়ই আজকের পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

শমীকের এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। তৃণমূল কি এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দেবে? নাকি বিজেপির এই অবস্থান বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দেবে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতার পালাবদলের পর এটাই হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা— বিজেপি কি সত্যিই দলবদলু রাজনীতির পথ বন্ধ রাখতে পারবে, নাকি বাস্তব রাজনীতি আবার অন্য গল্প লিখবে? এখন নজর সেদিকেই।