সুদীপ-কাকলিদের বড় পদক্ষেপে দিল্লিতে চাঞ্চল্য, সাংসদ পদ খারিজের দাবি বিরোধীদের; স্পিকারের সিদ্ধান্তেই কি নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ?
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
দিল্লির রাজনৈতিক করিডরে রবিবার যেন এক নতুন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। যে সাংসদরা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে [All India Trinamool Congress (AITC)]-এর প্রতীকে জিতে এসেছিলেন, তাঁদেরই একাংশ এবার প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন।
তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাঁরা আর আলাদা ব্লক গঠনের পথে হাঁটছেন না। বরং [Nationalist Citizens Party of India (NCPI)] নামের একটি স্বীকৃত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর সেই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ইতিমধ্যেই লোকসভার স্পিকারের কাছে চিঠিও জমা দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল রাজনৈতিক বিতর্ক। কারণ, এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সংসদে তৃণমূলের শক্তি ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অন্যতম মুখ [Kakoli Ghosh Dastidar] দাবি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সাংসদ রয়েছেন। স্পিকারের কাছে চিঠি জমা দেওয়ার পর তিনি বলেন, দলের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি তাঁদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। সেই কারণেই নতুন রাজনৈতিক পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, তাঁর বক্তব্যে আরও রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা ছিল। তিনি স্পষ্ট করেন, দেশের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী [Narendra Modi]-র নেতৃত্বে কাজ করতে তাঁরা প্রস্তুত। এই মন্তব্য ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে, বিদ্রোহী শিবিরের আরেক শীর্ষ নেতা [Sudip Bandyopadhyay] বলেন, তাঁরা কোনও নতুন সংসদীয় গোষ্ঠী তৈরি করছেন না, বরং একটি বিদ্যমান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একীভূত হয়েছেন। তাঁর দাবি, কোন গোষ্ঠী প্রকৃত তৃণমূল—সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর আদালতেই নির্ধারিত হবে।
তবে এখানেই শেষ নয়।
বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপকে সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী [Kapil Sibal]। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, কোনও রাজনৈতিক দলের কেবল একটি অংশ অন্য একটি দলে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সেই প্রশ্ন গুরুতর।
তাঁর বক্তব্য, গোটা রাজনৈতিক দল একীভূত হলে এক ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, কিন্তু দলের একটি অংশের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে এই সাংসদদের সদস্যপদ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এদিকে বিদ্রোহীদের পদক্ষেপ ঠেকাতে সক্রিয় হয়েছে মমতা শিবিরও।
[Abhishek Banerjee]-র পক্ষ থেকে লোকসভার স্পিকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, সংসদীয় বিধি অনুযায়ী একই রাজনৈতিক দলের দুটি পৃথক সংসদীয় ব্লক হতে পারে না। সেই চিঠিতে অনুরোধ করা হয়েছে, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যেন মূল দলের বক্তব্যও শোনা হয়।
তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, [Mamata Banerjee]-র নেতৃত্বাধীন দলই প্রকৃত তৃণমূল এবং বিদ্রোহীদের দাবি সাংবিধানিক ও সংসদীয় রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন প্রবীণ সাংসদ [Sougata Roy]। তাঁর অভিযোগ, এই গোটা ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে বিজেপির তথাকথিত “অপারেশন লোটাস”। তাঁর দাবি, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও অসন্তুষ্ট নেতাদের টার্গেট করেই বিরোধী দলগুলিকে ভাঙার চেষ্টা চলছে।
তবে বিদ্রোহী শিবির এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, যার সঙ্গে কোনও চাপ বা প্রলোভনের সম্পর্ক নেই।

এখন নজর একটাই জায়গায়—লোকসভার স্পিকারের সিদ্ধান্তে। বিদ্রোহীদের একীভূতকরণের দাবি স্বীকৃতি পাবে, নাকি সাংবিধানিক জটিলতায় নতুন সংঘাত শুরু হবে?
দিল্লির এই রাজনৈতিক দাবার ছকে পরবর্তী চাল কার, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। আর তার উত্তরই হয়তো বদলে দিতে পারে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ।