‘গাঁ-গঞ্জে যেখানেই বেআইনি মদ-জুয়ার ঠেক বা গাঁজা-চরসের কারবার চলছে, তা সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলতে হবে’ বারুইপুর থেকে নির্দেশ শুভেন্দুর
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
‘ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে, এটাকে গণপিটুনিতে হত্যা বলব না। নাম এবং পরিচয় দেখে তাঁকে খুন করা হয়েছে। এর পিছনে ভোটে যাঁরা প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েছেন, তাঁদের বড় উস্কানি আছে। উগ্রপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীও থাকতে পারে এই ঘটনার পিছনে। সেই সম্ভাবনা আমি উড়িয়ে দেব না। তাতে যতগুলো ছবি দেখা গিয়েছে, প্রত্যেককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। একজনকে বকখালি থেকে তুলেছে। একজনকে দিঘা থেকে তুলেছে। যাদের যাদের ভিডিয়ো ফুটেজে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা গিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে গ্রেফতার করা হবে।’ বারুইপুরের সূর্যপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার পরে উত্তেজনার মধ্যে পরিকল্পনা মাফিক নাম ও পরিচয় দেখে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে গণপিটুনিতে খুন করা হয়েছে বলে বিষ্ফোরক অভিযোগ করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
শনিবার বারুইপুরের সূর্যপুর ফাঁড়ির উদ্বোধনের পরে তিনি বলেন, ‘নাম-পরিচয় দেখে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে খুন করা হয়েছে। ভোটে যাঁরা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তাঁদের বড় উস্কানি রয়েছে। চরমপন্থী মৌলবাদী শক্তিও থাকতে পারে। অতিবামও থাকতে পারে। তদন্ত করছে পুলিশ। সামনে থেকে যারা করেছে, তাদের তোলা হচ্ছে। মোবাইলে যারা উস্কেছে, মেসেজ করে উস্কানি দিয়েছে যারা, নতুন সরকার আসার পর যারা বাংলাকে ডিসটার্ব করতে চায়, তাদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত হচ্ছে। যে দলেরই হোক, শিক্ষা দেবে পুলিশ। যত ছবিতে দেখা গিয়েছে, গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বকখালি, দিঘা থেকে তুলছে। ৩৫ বছরের অবিবাহিত যুবককে হাত-পা বেঁধে, নৃশংস ভাবে, সংগঠিত ভাবে মারা হয়েছে। বাবা-মায়ের হাতে ২৫ লক্ষ টাকার চেক তুলে দিয়েছি। বড় ছেলেকে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি দেওয়া হয়েছে। বাড়ি যেটা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, মেরামত হয়েছে দু’দিনে। বাবার বার্ধক্যভাতা, মায়ের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার চালু হয়েছে। আমরা পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছি।’
এলাকার মানুষকে আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নির্যাতিতার পরিবার বলছিল, প্রচুর গ্রেফতারি হচ্ছে। স্থানীয়রা চাপ দিচ্ছে। আপনি দেখুন। আমি বলেছি, রেললাইনে যারা লোহার বিম ফেলছিল, তারা কেউ ভারতপ্রেমী হতে পারে না। এটা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ। ইন্দ্রজিতের খুনিদের সঙ্গে প্যায়ার-মহব্বত হতে পারে না। বাকি যদি কোনও নিরীহ লোক প্রতিবাদে অংশ নিয়ে থাকুন, তাকে স্বাগত। গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষোভ দেখানোর অধিকার রয়েছে। নির্দেশ দিয়েছি, নিরীহদের উপর যেন পুলিশি অত্যাচার না হয়। ভিড়ের মধ্যে ধরে ফেললেও, যা সিস্টেম আছে, দেখবেন বিশেষ ভাবে। ভয়ে দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এসপি মাইকিং করবেন। তার পর নর্ম্যাল করে দিন। খুনি, ধর্ষক, রেললাইন যারা ভাঙতে গিয়েছি, তারা ভয়ে থাকুক। তাদের শিক্ষা দেওয়া আমাদের কাজ, আইনি পথে।’
পুলিশকে ফ্রি হ্যান্ড শুভেন্দুর
গতকাল মুর্শিদাবাদের মাটিতে দাঁড়িয়ে পুলিশকে ফ্রি হ্যান্ড দেওয়ার যে ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী তা যে বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গিয়েছে সেই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা বারুইপুরে পুলিশের ভূমিকা দেখেছেন, আরও দেখবেন। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, নারী নির্যাতনের সব কেস আবার খুলবে। এত পচন, এত সামাজিক দূষণ, এত নেশার জায়গা। একেবারে দূষিত করে গিয়েছেন আগের মুখ্যমন্ত্রী। বারুইপুরে ওই ছোট্ট একরত্তি পরিবার, তাঁরাও সংখ্যালঘু!’
বারুইপুরে কিশোরীকে নৃশংস নির্যাতন-খুনের ঘটনায় গত মঙ্গলবারের পর শনিবার ফের বারুইপুরে নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘প্রথম দিন থেকে আমাদের কথা শুনেছে। সাহায্য করেছে। পরিবারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। মঙ্গলবার দেখা করেছিলাম, যে ৪ জনের নাম বলেছিল, তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ ও এসটিএফ, ডিজিপির তত্ত্বাবধানে কাজ করেছে। কাস্টডি ট্রায়াল হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক নজির রাখব। সবটা আমার মনিটরিংয়ে থাকবে। সরকারের দায়িত্ব ছিল। কীভাবে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি, আমি বলব না। পরিবারই সময় মতো সবটা জানাবেন।’ এর পাশাপাশি নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে পূর্ব প্রথম তৃণমূল সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কার্যত কটাক্ষ করে শুভেন্দু বলেন, ‘আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীও। নিশ্চিন্ত থাকুন, এসব ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কোনও ত্রুটি রাখবে না। ছোট ঘটনাও বলবে না, লভ অ্যাফেয়ারও বলবে না, মহিলাটা অন্তঃসত্ত্বাও বলবে না, ১০ লক্ষ দেওয়া যেতেই পারে-এই ধরনের কথা এই সরকার বলবে না, নিশ্চিন্ত থাকুন।’
বারুইপুর থেকে কামদুনি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘কামদুনি মামলায় অভিযুক্তদের বারাসাত কোর্টে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। হাইকোর্টে ১৬টি পিপি পরিবর্তন করে ঠিকঠাক মনিটরিংই হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল কামদুনির নির্যাতিতার পরিবার। কামদুনির নির্যাতিতার পরিবারকে সরকারি আইনজীবী দিয়ে সাহায্য করে সরকার।’
মাদকবিরোধী অভিযানের নির্দেশ
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ রাজ্যের প্রশাসনিক ও পুলিশি কর্তাদের সামনে অপরাধ দমনে বিশেষ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, যে কোনো জঘন্য অপরাধের নেপথ্যে সাধারণত কিছু সামাজিক ব্যাধি কাজ করে। ডিজিপি-কে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী দু-সপ্তাহ গোটা রাজ্য জুড়ে স্পেশাল ড্রাইভ বা বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। ব্যাটালিয়নে থাকা যে সমস্ত পুলিশ কর্মীরা সরাসরি থানার দৈনন্দিন কাজে যুক্ত থাকেন না, তাঁদের এই বিশেষ অভিযানে নামানো হোক। সিও-দেরও এক একটি জেলার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হোক।’ মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ, ‘একেবারে রুরাল এলাকা বা গাঁ-গঞ্জে যেখানেই এই ধরনের বেআইনি মদের ঠেক বা গাঁজা-চরসের কারবার চলছে, তা সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলতে হবে। এই সামাজিক দূষণ থেকে আমাদের পরিবেশ ও সমাজকে বাঁচাতে হবে।’

বারুইপুরের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বেআইনি মদের কারবার এবং মাদকের বিস্তার বর্তমান সময়ে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। সমাজকে এই দূষণ থেকে মুক্ত করতে এবার গোটা রাজ্যে বড়সড় পুলিশি অভিযান চালানো হবে। প্রশাসনের দাবি, শুধুমাত্র অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত করাই যথেষ্ট নয়, অপরাধের জন্মস্থান বা উৎসস্থলগুলিকেও নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। এদিন মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য পুলিশের ডিজিপি-কে আগামী দুই সপ্তাহের জন্য রাজ্যজুড়ে একটি বিশেষ ও নিবিড় অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এই অভিযানে কেবল স্থানীয় থানার পুলিশই নয়, প্রয়োজনে ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ কর্মীদেরও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি জেলার নিজস্ব ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিস্থিতির নিরিখে এই অভিযান পরিচালনা করতে হবে। প্রতিটি জেলার এসপি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো এলাকাতেই বেআইনি মদের ঠেক বা মাদক পাচারের কোনো চক্র মাথাচাড়া দিতে না পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, বিশেষ এই তল্লাশি অভিযানে বেআইনি মদের ভাটি, মাদক পাচারের সম্ভাব্য কেন্দ্রবিন্দু এবং অসামাজিক কার্যকলাপের আস্তানাগুলোকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও বেশি সক্রিয় ও দায়িত্ববান হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপে যারা জড়িত, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।