“‘ভাইপো তৃণমূলকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্মূল করব’, অভিষেককে প্রকাশ্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ শুভেন্দু অধিকারীর”
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
‘আড়াই হাজার লোক নিয়ে বড় কথা। ক্ষমতা থাকলে ডায়মন্ড হারবারে দাঁড়ান।’ বুধবার রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এভাবেই তৃনমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একুশের মঞ্চ থেকে দেওয়া হুঁশিয়ারির পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গতকাল অর্থাৎ মঙ্গলবার একুশে জুলাই শহীদ দিবসের মঞ্চ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ‘ফুটপাতে থাকব, লড়াই করে বিজেপিকে হারাব। দেখি ওরা কী করতে পারে।’
মমতাকে হুঁশিয়ারি
বুধবার বিধানসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, যে সব মামলা বন্ধ হয়েছে, সেগুলি আবার খোলা হবে। শুভেন্দু বলেন, ‘আপনি বলেছেন, বেঁচে আছি দেখে নেব… বেঁচে থাকতে থাকতে প্রাক্তন হয়েছেন। বেঁচে থাকতে থাকতে আপনি যে প্রতিষ্ঠিত চোর, সেটাও প্রমাণ করব। বেঁচে থাকতে থাকতে সব দেখে যাবেন।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের আমলে, তথা ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর যে হিংসার অভিযোগ উঠেছিল, সে কথাও এদিন উল্লেখ করেন শুভেন্দু। স্বরাষ্ট্র বাজেট নিয়ে আলোচনায় বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি যা করেছেন, ২১-এর নির্বাচনের পর, ৪৭-এর আগে ব্রিটিশরাও তা করেনি। আপনি কী ভাবছেন আমি ছেড়ে দেব? দরকার হলে সিবিআই-কে লিখব, আবার আমাদের দিয়ে দিন।’
গতকাল একুশে জুলাই শহীদ দিবসের মঞ্চ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে একের পর এক হোমগার্ড দিয়েছিলেন বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই এর জন্য তার প্রেক্ষিতে আজ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে আক্রমণ করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। এদিন বিধানসভায় স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেটের উপরে আলোচনায় জবাবি ভাষণ দেন মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানেই নাম না করে অভিষেককে নিশানা করেন। তৃণমূলের শহিদ দিবস নিয়ে খোঁচা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কালকে তো শহিদ দিবস হয়নি। কেউ বলছে, ভাইপো প্যারাসুটে নেমেছে। আর ভাইপো বলছে, নোট-খাতা খুলে রাখো, একত্রিশে হিসাব হবে। আরে তুমি বাইরে থাকলে তো হিসাব হবে। ৪ মের পর ডায়মন্ড হারবার গিয়েছ? জোকা পেরিয়েছ? যাও না ডায়মন্ড হারবার। পান্নালাল হালদার (ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল বিধায়ক) নিয়ে যান চ্যাম্পিয়ন এমপি-কে। আপনি এমপি। আঞ্চলিক দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। গরুর গাড়ির হেডলাইট। ফলতাতে আপনাদের প্রার্থী দাঁড়ালেন। নিজেকে পুষ্পা বলছিলেন। আপনি কি সেখানে প্রচারে গিয়েছিলেন?’ ফলতার পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সেকথা স্মরণ করিয়ে অভিষেককে ছোঁড়া বলে উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, ‘ওই ছোঁড়াকে বলে গেলাম, প্রতিষ্ঠিত চোর। ভিতরে থাকবেন কী বাইরে থাকবেন, ভবিষ্যৎ বলবে। যেখানেই থাকুন, ডায়মন্ড হারবারে লড়ুন। আপনি যত ভোটে জিতেছেন, তত ভোটে হারাব। আপনার অবস্থা পুষ্পার চেয়েও খারাপ হবে।’ প্রসঙ্গত, গতকালও শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘ওকে আমি কাউন্টার করব না। ও অনেক বড়-বড় কথা বলে। তবে একটাই কথা বলব, ওঁর বাপের নাম যদি ঠিক থাকে, তাহলে আগামী লোকসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবারে লড়বে।’ গতকাল কালীঘাট তৃণমূলের শহিদ দিবসের অনুষ্ঠানে ভিড় নিয়ে এদিন বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিড়লা তারামণ্ডলে ওইটুকু জায়গায় কত লোক হয়েছে? পুলিশ রিপোর্ট দিয়েছে। আড়াই হাজারের একটু বেশি হয়েছে।’ মমতা অভিষেককে বাঘ বলে উল্লেখ করেছেন। এদিন তা নিয়েও কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ওটা বাঘ না বিড়াল। ফলতায় একবার দেখেছেন। যত চুরি-ডাকাতি করেছেন, গর্ত খুঁড়ে বের করব। এই ভাইপোপন্থী তৃণমূলের নাম-নিশানা পশ্চিমবঙ্গে থাকবে না। এটা আমার দায়িত্ব।’
ক্যাগ রিপোর্ট প্রকাশের ঘোষণা
আমফান ত্রাণ দুর্নীতি নিয়ে বহু প্রতীক্ষিত ক্যাগ (কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া) রিপোর্ট শনিবার বিধানসভায় পেশ করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও ক্যাগ রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ বা তা নিয়ে আলোচনা করেনি। এবার রিপোর্ট প্রকাশের পর বিধানসভায় তা নিয়ে আলোচনা হবে এবং সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বুধবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, যেখানে যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে, সেখানে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযুক্ত ব্যক্তি মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী বা প্রভাবশালী নেতা– যে-ই হোন না কেন, তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের সুপারিশ রাজ্যপালের কাছে পাঠানো হবে বলেও তিনি জানান। ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আমপানে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী ও সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তহবিল থেকে দুই দফায় ৩,৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই সাহায্য পাননি। বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হলে বিশেষ ক্যাগ তদন্ত হয়। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সেই তদন্তের রিপোর্ট এতদিন প্রকাশ করা হয়নি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুপারিশ অনুযায়ী কোনও পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।