সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“আমরা সকলেই মাতৃভাষায় কথা বলি। শিশুরা প্রথমে তাঁদের মাতৃভাষাতেই মা বলে। এবার দেখছি বাংলা ভাষা নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করতে চাইছে। আমাদের উচিত আরেকটি ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা নিয়ে দেশজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অনেক জায়গাতেই শুধু বাংলা ভাষা বলার কারণে হেনস্থা করা হচ্ছে। শুধুমাত্র বাংলা ভাষা বলার জন্য নির্যাতন করা যাবে না। এটা সহ্য করা যাবে না। এই নিযে বৃহত্তরভাবে কর্মসূচি করতে হবে।” এভাবেই ভারতের বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্য বাংলা ভাষা বাঙ্গালীদের ওপরে অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে ভাষা আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি তুলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “প্রয়োজনে আবার ভাষা আন্দোলন হবে, কিন্তু মাতৃভাষাকে রক্ষা করতেই হবে। ভাষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি জাতির মেরুদণ্ড। শিশুরা যেমন প্রথম ‘মা’ বলতে শেখে, সে রকম আমরা মাতৃভাষায় কথা বলা শিখি। সেই বাংলা ভাষার উপর আজ ভাষা-সন্ত্রাস চলছে। বাংলা ভাষায় যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের উপর অত্যাচার হচ্ছে। আর একটা ভাষা আন্দোলন চাই, সমাজকে জাগ্রত করতে হবে।’’ মমতা জানান, সংখ্যার নিরিখে বাংলা ভাষা সারা পৃথিবীতে পঞ্চম স্থানে রয়েছে, এশিয়ায় দ্বিতীয় স্থানে। বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি লোক এই ভাষায় কথা বলেন। অথচ এই ভাষায় কথা বলার জন্য জেলে যেতে হচ্ছে। বাংলা ভাষায় কথা বললেই তাঁকে দেশান্তরী হতে হচ্ছে! বাংলা চলচ্চিত্র ও গানের পাশে দাঁড়ানোর বার্তাও দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘বাংলা ভাষাকে অপমান করবেন না। অন্য ভাষাকে অসম্মান করতে বলছি না, কিন্তু বাংলায় যাঁরা গান গাইছেন, কাজ করছেন, তাঁদের একটু বেশি গুরুত্ব দিন। সব ভাষার সমন্বয়ে ঐক্য ও সম্প্রীতি গড়ে উঠুক।’’
এবার হরিয়ানার গুরুগ্রামে বাঙালি হেনস্তার অভিযোগ উঠল। অমানবিক ভাবে বাংলাভাষী শ্রমিকদের মারধর করে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বলে একটি ভিডিও পোস্ট করে অভিযোগ করেছেন তৃণমূলের রাজ্য মুখপাত্র পার্থপ্রতীম রায়। তৃণমূলের রাজ্য মুখপাত্র পার্থপ্রতীম রায় একটি ভিডিও পোস্ট করে অভিযোগ করেছেন যে, গুরুগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাভাষীদের আটকানো হচ্ছে এবং মারধর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এই ভিডিও দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, বাংলাভাষীদের হেনস্তার বিষয়টি তিনি বিভিন্ন মহলে জানিয়েছেন এবং ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ারও করেছেন। তাঁর অভিযোগ, যারা কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে গিয়েছেন, তাদের ওপর এই ধরনের অত্যাচার করা হচ্ছে।
এই বিষয়টি জানার পরেই মুখ্যমন্ত্রী নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লেখেন, লিখেছেন, ‘আমাদের বাংলা ভাষা এবং বাংলার সংস্কৃতি আমাদের গর্ব। আমরা বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে দেখেছি বাংলা ভাষাভাষীদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে, বাংলা ভাষায় কথা বললে তাঁদের আটক করছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। আমরা সব ভাষাকে সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু বাংলা ভাষাকে অপমান আমরা কখনও সহ্য করব না। আমি, বাংলার মানুষ-সহ সংস্কৃতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার্থে ‘ভাষা আন্দোলন’-এ শামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি আমাদের জাতির মেরুদণ্ড। এই বাংলা আমাদের জন্মভূমি, কর্মভূমি, নবজাগরণের ভূমি, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-বিদ্যাসাগর-বিবেকানন্দের ভূমি। রামকৃষ্ণদেবের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়ের’ ভূমি। আসুন আমরা একত্রিত হয়ে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতিকে রক্ষা করি। জয় হিন্দ! জয় বাংলা!’

প্রসঙ্গত, গত কয়েক মাস ধরে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর বিভিন্ন রাজ্যে অত্যাচারের অভিযোগ উঠছে। কখনও মারধর, কখনও তাঁদের ওপর হামলা, লুটপাট, উপার্জন কেড়ে নেওয়া, আবার কখনও পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের ঘটনার প্রতিবাদে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আন্দোলন করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি দুর্গাপুরের এক সভামঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, যারা অনুপ্রবেশ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে সংবিধান মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রেক্ষাপটে গুরুগ্রামের এই ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়াল।