বিহারে ভোটার তালিকা থেকে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে তীব্র ভর্ৎসনা করল দেশের শীর্ষ আদালত। এই ঘটনা ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল রাজনৈতিক বিতর্ক। মূল অভিযোগ, মুসলিম ও মহিলা ভোটারদের একটি বড় অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ালে আদালত নির্বাচন কমিশনের যুক্তিকে নাকচ করে দিয়েছে এবং আধার কার্ডকে পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছে।
📌 কি ঘটেছিল বিহারে?
২০২৫ সালের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত হতে চলা বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বিহারে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী অভিযান চালায় নির্বাচন কমিশন। সেই অভিযানের ফলাফল চমকে দেওয়ার মতো – এক ধাক্কায় প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে। যার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিলেন মুসলিম ও মহিলা ভোটার।
বিরোধীদের দাবি, এই বাদ দেওয়া ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এর মাধ্যমে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। এমনকি কমিশনের শীর্ষ কর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তারা অবসর জীবনে সুবিধা পাওয়ার লোভে এই কাজ করেছেন।
⚖️ সুপ্রিম কোর্টে শুনানি ও তীব্র ভর্ৎসনা
এই ঘটনাকে ঘিরে আদালতে মামলা হলে, বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির ডিভিশন বেঞ্চ শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, “আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়”, তাই সেটিকে গ্রহণ করা যায় না।
কিন্তু আদালত বলে দেয় – আধার একটি আইনত স্বীকৃত নথি, যা পরিচয় ও স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ। সে ক্ষেত্রে সেটিকে গ্রহণ করতে আপত্তি কোথায়?
বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন:
“নাগরিকদের নিজস্ব সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়লে, রাজনৈতিক দলের পিছনে দৌড়তে হবে কেন?”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন – যদি বলা হয়, ২২ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছেন, তবে তার প্রমাণ কোথায়? বুথ স্তরে কেন সেই তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না?
📜 স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থে কড়া নির্দেশ
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি বলেন:
“কোনও নাগরিকের নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলার আগে তাদের জানানো বাধ্যতামূলক। এটি একটি মৌলিক অধিকার।”
তিনি কমিশনকে নির্দেশ দেন:
-
বাদ পড়া ৬৫ লক্ষ ভোটারের তালিকা আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে।
-
ওয়েবসাইটে তালিকা আপলোড করতে হবে যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
-
প্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের জানাতে হবে তারা কেন তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
🧾 আধার কার্ড – এখন বাধ্যতামূলক পরিচয়পত্র
এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে আধার কার্ডকে বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করতে হবে।
আদালতের কথায়:
“আধার কার্ড একটি আইনসম্মত ও স্বীকৃত নথি। সেটিকে গ্রহণ না করার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।”
⚠️ নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে
এই রায়ের পর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও তার দুই সহযোগীকে ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থা ফেরানোর দিকেও এক বড় পদক্ষেপ।
‘Aadhaar voter list Supreme Court’ রায়টি ভারতীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করল। ভোটাধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, এবং সেই অধিকারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খর্ব করা হলে আদালত যে কঠোর ব্যবস্থা নেবে – তা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল।
ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রুখতে এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া বজায় রাখতে এই রায় এক দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হবে।