সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
“যদি কোথাও কোনও গরমিল থাকে, তাহলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করবেন?” এভাবেই আজ জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ইন্ডিয়া অ্যালায়েন্সের শরিক রাহুল গান্ধীর পাশে দাঁড়ালেন, সঙ্গে এক হাত নিলেন নির্বাচন কমিশনারকেও। এফিট ডেফিট নির্দেশের বিষয়টিকে ইস্যু করে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করলেন, “নির্বাচন কমিশন বলছে, এক সপ্তাহের মধ্যে এফিডেফিট জমা দিতে হবে, কিন্তু কেন? দায় তো নির্বাচন কমিশনের। বিহারে এসআইআর করছে, তাতে ৬৫ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আছে তো এফিট ডেফিট দিয়ে বলবে, যদি কোথাও কোনও গড়মিল থাকে, তাহলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্য়াগ করবেন? তাহলে সেটা এফিডেফিট দিয়ে বলুক।” তিনি চ্যালেঞ্জের সুরে বলেন, “যদি নির্বাচন কমিশনার এফিট ডেফিট দেন, তাহলে আমি বলছি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলিও এফিডেফিট দেবে।”
বিহারে এসআইআর-এ ৬৫ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে। এসআইআর নিয়ে দেশ জুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের আবহে কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলেছেন। রবিবার দিল্লি থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার , দাবির সপক্ষে এক সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। আর সেই বিষয়টি নিয়েই সরব হন অভিষেক।
কলকাতা বিমানবন্দরের বাইরে সর্বভারতীয় তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বিজেপি জনগণের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে; তারা নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। আপনারা ১০০ দিনের কাজের বিষয়েও জিজ্ঞেস করেছিলেন। কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্ট বলেছিল যে, ১ আগস্টের মধ্যে কাজ শুরু করতে ও অর্থ ছাড়তে হবে। কেন্দ্র এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায়। ইতিমধ্যেই বকেয়া অর্থ ছাড়ার বদলে আবারও তারা এর বিরোধিতা করেছে। ইচ্ছে করেই বাংলাকে আরও বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিজেপি জনবিরোধী, বাংলা-বিরোধী, গরিব-বিরোধী এবং সংবিধান-বিরোধী। গত ১১ বছর ধরে আপনারা দেখেছেন, বিজেপি কীভাবে সরকার চালিয়েছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনও স্বীকার করেছে যে, প্রচুর মৃত ভোটার আছে। যদি ২০২৪-এর নির্বাচন এমন তালিকার ভিত্তিতে হয়ে থাকে, তাহলে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত চালানো উচিত। এখন কমিশন বলছে, যাদের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে, তারা সাত দিনের মধ্যে হলফনামা না দিলে তাদের দাবি গ্রহণযোগ্য হবে না।
আমি যদি বলি, ২০২০ থেকে ইডি ও সিবিআই আমার বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে, অথবা বহু মানুষকে বছরের পর বছর জেলে রাখা হয়েছে অথচ সিবিআই কোনও প্রমাণ পেশ করতে পারেনি—তাহলে কি সেটা মানে সিবিআই ভুল? সত্যেন্দ্র জৈনের উদাহরণ নিন, যিনি তিন বছর ধরে জেলে। সিবিআই তাঁর বিরুদ্ধে কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি। তাহলে কি তিনি সঠিক আর সিবিআই ভুল? গত পাঁচ বছর ধরে ইডি-সিবিআই তদন্ত করছে, কিন্তু আদালতে প্রমাণ দিতে পারেনি। কেস ডায়েরি চাইলে তাদের কাছে কিছুই ছিল না। তাহলে তাদের তদন্তের কোনও মূল্য নেই। তাহলে নির্বাচন কমিশন কেন হলফনামা দাবি করছে? বিহারে ৬৫ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যদি সেই তালিকায় একটি নামও ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে কি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করার সাহস দেখাতে পারবেন? বিজেপি কমিশনকে ব্যবহার করছে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিতে। একজন বাঙালির নাম যদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে এক লক্ষ বাঙালি মিছিল করে তাদের শক্তি দেখাবে।”
পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কৈলাস বিজয়বর্গীয়র ছেলে সরকারি কর্মীদের ব্যাট দিয়ে মারধরের অভিযোগে অভিযুক্ত। তাকে কি প্রশ্ন হয়েছে? আমরা দল হিসেবে এর নিন্দা করি, কোনওভাবেই হিংসাকে সমর্থন করি না। কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা যারা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, তাদেরও প্রশ্ন করতে হবে, সেই দায়িত্ব আপনাদের। ডায়মণ্ড হারবারের জন্য অনুরাগ ঠাকুর অভিযোগ করেছিলেন, একটি বুথে অনেক ভোটার আছে। ৪৭ জনের মধ্যে আমি প্রমাণ দিয়েছিলাম যে ৪১ জন ভোটার জীবিত আছেন, আর ৬ জন হয় বিয়ের পর অন্যত্র গেছেন অথবা মারা গেছেন। আমি তাদের বয়ান রেকর্ড করে প্রমাণ অনুরাগ ঠাকুরের বাড়িতে পেনড্রাইভে পাঠিয়েছিলাম। কর্ণাটকে কংগ্রেস যে অভিযোগ তুলেছে, মহাদেবপুরায় ৮x১০ ঘরে ১৫০ জন ভোটার আছেন। এই প্রশ্নগুলো নির্বাচন কমিশনের দিকে, কিন্তু কেন বিজেপি তাদের পক্ষ নিচ্ছে? আমরা যদি ইডি, সিবিআই বা নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করি, তাহলে বিজেপির নেতারা কেন তাদের হয়ে উত্তর দিচ্ছে? আমরা অনুরাগ ঠাকুরের অভিযোগের জবাব দিয়েছি, কিন্তু আমরা যে প্রশ্ন তুলেছি, তার উত্তর কে দেবে? কেন্দ্রীয় সরকারকে ইস্তফা দিতে হবে। এই একই ভোটার তালিকার মাধ্যমেই তারা ক্ষমতায় এসেছে। যদি তালিকা অবৈধ হয়, তাহলে তাদের নির্বাচনও অবৈধ।
আমরা ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে হাইকোর্টে গিয়েছি। নির্বাচন কমিশন বি.এল.এ কর্মকর্তাদের নাম-ঠিকানা চাইছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সমস্ত বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, শুধু বিজেপির হয়ে কাজ করছে। তাদের কাছে এই তালিকা দিলে সেটা বিজেপির হাতেই পৌঁছবে। আমার নিজের ক্ষেত্রে, আমি যে নথি ইডিকে দিয়েছিলাম, তা গিয়ে পৌঁছেছিল বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে, যার জন্য আমাকে আদালতে যেতে হয়েছিল। প্রতিটি কেন্দ্রীয় সংস্থা, যেখানে আমরা নথি বা প্রমাণ দিই, তা বিজেপির কাছে চলে যায়। সেই কারণেই আমরা একদম নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে তালিকা দেব। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নয়, পক্ষপাতদুষ্ট এবং সংবিধানের স্বার্থে কাজ করছে না। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে লড়াই সর্বত্র চলবে।”
নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যদি আমরা ইমপিচমেন্ট মোশান আনতে চাই, তাহলে ১৪ দিনের নোটিশ দিতে হবে। যেহেতু সংসদ ২১ তারিখে শেষ হচ্ছে, এই অধিবেশনে সেটা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন যেভাবে কাজ করছে, তাতে নিশ্চিতভাবেই সেটা আনা হবে—এখন না হোক, পরের অধিবেশনে।”

শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, “বাঁকুড়ার সারেঙ্গায় মহিলাদের দেখে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর যে কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার, আমরা আজ সেই ভিডিও টুইটারে পোস্ট করব। নাটক করার আগে তিনি ক্ষমা চান। এটাই ওদের শিক্ষা, ওরা ভালোভাবে কথা বলতে জানে না, সম্মানের রাজনীতি বোঝে না। যারা মহিলাদের ও পুলিশের বিরুদ্ধে এই কটু ভাষা ব্যবহার করে, তাদের আদালত নিঃশর্ত সুরক্ষা দেয়। আমি বিচারপতিদের প্রশ্ন করছি: পুলিশ অফিসাররা যারা আইন-শৃঙ্খলার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেন, প্রতিটি উৎসবে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন—আপনারা কীভাবে তাদের গালিগালাজ করা কাউকে সুরক্ষা দেন?”