সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে ফেলতে চক্রান্ত করছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল সাংসদরা অভিযোগ করেছেন যে, নতুন বিল এনে কেন্দ্রীয় সরকার সিবিআই এবং ইডি-কে রাজ্য সরকারগুলিকে ‘সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত’ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক, লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “২৫-২৬ জন সাংসদ আজ সংসদে ছিলেন আমাদের। তাঁদের জন্যই আজ চারদিকে মার্শাল নিয়ে চতুর্থ সারিতে বসে বিল পেশ করতে হয়েছে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি, বিশ্বগুরুর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। আমাদের এখন ২৮ জন সাংসদ লোকসভায়, ২৯টিতে আমরা জিতেছিলাম। বসিরহাটের সাংসদ প্রয়াত হয়েছেন, গোহারা হারবে বলে সেখানে ভোট করাচ্ছে না। বাংলার মানুষ যদি আমাদের ৪০টি আসনে জেতাতেন লোকসভা নির্বাচনে, তাহলে অমিত শাহ-সহ বিজেপির তাবড় নেতাদের সংসদের শেষ সারিতে গিয়ে বসতে হতো। অমিত শাহ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্য, ব্যর্থ। তাঁকে স্বরাষ্ট্র, সমবায় মন্ত্রক থেকে সরিয়ে নতুন সরকার ফেলার মন্ত্রক খুলে তাঁর মন্ত্রী করুন প্রধানমন্ত্রী। বিগত ১০ বছরে ইডি ৫৮৯২টি মামলার তদন্ত করেছে, কনভিকশন হয়েছে ৮টিতে, অর্থাৎ তদন্তে সাফল্যের হার ০.১৩ শতাংশ। ফলে বোঝাই যাচ্ছে সবগুলি মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ৯৯.৯ শতাংশ মামলার ক্ষেত্রেই তো ব্যর্থ ইডি। তাহলে ইডি তুলে দেওয়া হোক। সুপ্রিম কোর্টও তো বলেছে ইডি সংবিধান-সহ যাবতীয় বিষয়কে লঙ্ঘন করছে। বিলে বলা হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা বিভিন্ন রাজ্যের মন্ত্রী যদি ৩০ দিন ধরে গ্রেফতার থাকেন, তাহলে ৩১ দিনের মাথায় তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেওয়া হবে না! দেশে আইন, আদালত আছে তো। আমি অমিত শাহকে চ্যালেঞ্জ করছি, ৩০ দিন কমিয়ে ১৫ দিন করা হোক। তবে বিলে এ কথা উল্লেখ থাক, যদি গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ১৫ দিনের মাথায় প্রমাণ করা না যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী অফিসার থেকে শুরু করে তদন্তকারী সংস্থার জয়েন্ট ডিরেক্টর-সহ পদাধিকারীদের তার দ্বিগুণ সংখ্যক দিন জেলে থাকতে হবে। আসলে এই বিল গিমিক ছাড়়া কিছু নয়।”
কেন্দ্রের সরকার বুধবার সংসদে তিনটি বিল পেশ করার পরিকল্পনা করেছে। এই বিলগুলি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, অথবা কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মন্ত্রী যদি ৩০ দিনের জন্য গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগে গ্রেফতার হন, তাহলে তিনি বা তাঁরা পদ হারাবেন। যদি উল্লিখিত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ একটানা ৩০ দিন হেফাজতে থাকেন এবং সেই অপরাধের জন্য ন্যূনতম পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকে, তাহলে ৩১তম দিনে তাঁরা পদচ্যুত হবেন। এই বিলগুলির মধ্যে রয়েছে দ্য গভর্নমেন্ট অফ ইউনিয়ন টেরিটরিজ (সংশোধনী) বিল ২০২৫; দ্য কনস্টিটিউশন (ওয়ান হান্ড্রেড অ্যান্ড থার্টিথ অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৫; এবং দ্য জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর রিঅর্গানাইজেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৫।
এই বিলগুলোর তীব্র সমালোচনা করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বিরোধীদের চাপে রেখে ভয় দেখাতেই এই বিল। বিজেপি বিভিন্ন রাজ্যে সরকার ফেলতে নানা কৌশল নিয়েছে। সঠিকভাবে নির্বাচন হলে এবারও লোকসভা ভোটে বিজেপি ১০০-র বেশি আসন পেত না। অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সত্যেন্দ্র জৈন, মণীশ সিসোদিয়া, সঞ্জয় রাউত থেকে শুরু করে হেমন্ত সোরেন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়দের ইডি, সিবিআই লাগিয়ে জেলে পাঠিয়েছিলেন। অভিযোগ প্রমাণ করুন। যাঁদের দু-তিন বছর ধরে জেলে রেখেছেন, কে ফেরাবে তাঁদের এই সময়। তদন্তের নামে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে কাউকে জেলে রাখা যায় না। আমিও তো লড়ছি ইডি-সিবিআইয়ের বিভিন্ন মামলায়। কোর্ট কেস ডায়েরি চাইলেও তা জমা দিতে পারছে না। কেন্দ্র চাইছে বিরোধীদের ইডি, সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে দলবদল করতে, সরকার দখল করতে। ২৪০ আসন নিয়েই সংবিধানে এমন বদল আনতে চাইছে। যদি ৪০০ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসতো তাহলে কী হতো! গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল রাখাই ওদের একমাত্র লক্ষ্য।”
তৃণমূলের লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেছেন যে, এই বিল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং বিচারব্যবস্থা উভয়কেই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। এক্স প্ল্যাটফর্মে তিনি লেখেন, “বিরোধীদের পূর্বাভাস সত্যি হল – বিজেপি মাত্র ২৪০ জন সাংসদ নিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করছে। নতুন বিল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং বিচারব্যবস্থা উভয়কেই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে – কেন্দ্রীয় সরকার ইডি-সিবিআই ব্যবহার করে নির্বাচিত বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করতে পারবে এবং আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও তাদের বরখাস্ত করতে পারবে।”
এক্স প্ল্যাটফর্মে তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন লেখেন, “রাতের আঁধারে, ২৩৯ আসনের দুর্বল মোদী জোটের আরও কৌশল, যখন তারা সংসদকে উপহাস করার নতুন উপায়।” কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় এই তিনটি বিলকে সংসদের একটি যৌথ কমিটির কাছে পাঠানোর প্রস্তাবও উত্থাপন করবেন বলে জানা গিয়েছে।