সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
পঞ্চলক্ষ মানুষ একযোগে ভগবত গীতা পাঠ করলেন-এমন দৃশ্য দেখে কলকাতায় যেন মহাকুম্ভ মেলার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করলেন বাগেশ্বর ধাম সরকার আচার্য ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী। শহরে অনুষ্ঠিত গীতাপাঠ অনুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতার মানুষের ভক্তি ও উচ্ছ্বাস দেখে হৃদয় ভরে গেছে। সনাতন ঐক্যই এই দেশ ও বিশ্বের শান্তির বড় মাধ্যম। আমরা চাই ভারতের মাটিতে ‘সনাতনি’, না যে ‘তানাতানি’। আমরা চাই ‘ভগওয়া-এ-হিন্দ’, না ‘গজওয়া-এ-হিন্দ’।’ গীতাপাঠের অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই হিন্দুরাষ্ট্রের পক্ষে সওয়াল বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রদেশ যখন এক হয়, তখন দেশ তৈরি হয়। তাই বাংলার হিন্দুদের উদ্দেশে আমার বার্তা, আপনারা যখন এক হবেন তখনই ভারত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হবে।’ এদিকে বাবরি মসজিদ নিয়ে তিনি বলেন, ‘যাঁরা এক সময় ভারতে আক্রমণ চালিয়েছিল, তাঁদের নামাঙ্কিত এই দেশে কি কোনও কিছু তৈরি করা উচিত? আমাদের মাথায় রাখতে হবে এটা বাবরের দেশ নয় রঘুবরের দেশ।’
ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সনাতন সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ ঘিরে তৈরি হল নয়া ইতিহাস। রবিবার সকাল থেকে এই অনুষ্ঠানে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা সহ ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল ও বাংলাদেশ থেকেও ধর্মপ্রাণ ভক্তরা যোগ দেন। বিপুল জনসমাগম ও নিরাপত্তার জন্য ২৫টি গেট এবং তিনটি সুসজ্জিত মঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে; উদ্যোক্তারা এটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন বলে দাবি করলেও, বাংলায় ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এই বিশাল সমাবেশ রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে।
ভক্তদের ভিড় সামলাতে হাওড়া স্টেশন থেকে গঙ্গা ফেরিঘাট পর্যন্ত বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থা ছিল। সকালে হাওড়া স্টেশন চত্বরে ভক্তদের ঢল নামে, যেখানে গীতার ছোট বই বিলি করা হয় এবং খোল-করতাল সহযোগে নামসংকীর্তন করতে করতে বহু মানুষ ব্রিগেডের দিকে এগিয়ে যান। রাজ্যের বাইরে থেকেও আসা এই ভক্তরা জানান যে, সামাজিক শান্তি, সাম্য এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতেই তাঁরা এই গীতাপাঠের আয়োজনে সামিল হয়েছেন। আজকের অনুষ্ঠানে গীতার প্রথম, নবম ও অষ্টাদশ অধ্যায় পাঠ করা হয়। আজ গীতাপাঠ শুরুর আগে ব্রিগেডে বেজে উঠেছিল বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ।
রবিবার দুপুরে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সনাতন সংস্কৃতি সংসদের আয়োজনে গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে যোগ দেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা বেলডাঙা রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান মহারাজ প্রদীপ্তানন্দ অর্থাৎ কার্তিক মহারাজ। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে একই সংগঠনের উদ্যোগে ব্রিগেডেই হয়েছিল গীতাপাঠ। এদিকে এবারের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত থাকলেও দেখা যায়নি রামদেবকে। এছাড়া আমন্ত্রণ গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও। তবে বিজেপির শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদার, দিলীপ ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারী, অগ্নিমিত্রা পালরা গিয়েছিলেন।
আজকের অনুষ্ঠানে গিয়ে সুকান্ত বলেন, ‘আমরা গতকাল যা দেখেছি, তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে হিন্দু ভোটকে ভাগ করা এবং মুসলিম ভোটকে এক করার চক্রান্ত চলছে। যা হচ্ছে তার জন্য দায়ী হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বারবর তোল্লা দিয়ে উপরে তুলেছে। একুশের ভোটে তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সিংহভাগ হিন্দু ভোট দেয়নি। হিন্দুরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশ্বাস করে না।’ এদিকে আজকে মঞ্চে না বসে মাটিকে বসে গীতাপাঠ করতে দেখা যায় শুভেন্দুকে। ব্রিগেডে গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে রাজ্য সরকারকে নিশানা করে শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘রাজ্য সরকারের অনুমোদনে বাবরি মসজিদ হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বাবরের শাসন চলছে, এই সরকার হিন্দু বিরোধী সরকার। এই সরকার ভারতীয় মুসলিমদেরও পক্ষে নয়, মৌলবাদের পক্ষে, বিচ্ছিন্নবাদের পক্ষে। ভারতবর্ষে মাটিতে, শ্রীকৃষ্ণের মাটিতে গীতাপাঠ হবে তা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। এর জন্য সংঘবদ্ধ হতে হচ্ছে মানুষকে। আর তার জন্য় নানারকম সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। এটাই প্রমাণ করছে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কেমন। এই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশী হিন্দু, উদ্বাস্তুদের বিরোধী সরকার। এই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মনে করছেন এটি একটি পৃথক দেশ। আর তিনি সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু বাস্তবে তো তা হতে পারে না।’
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ৫ লক্ষ কণ্ঠে গীতা পাঠের ঐতিহাসিক কর্মসূচিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র জল্পনা তৈরি হয়েছে। আমন্ত্রণ সত্ত্বেও তাঁর যোগ না দেওয়া প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা। তিনি দাবি করেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী আসবেন না তো। মুখ্যমন্ত্রী আসলে ভোট কমে যাবে। কারণ মুসলমানরা এখন যদি ক্ষেপে যায়, তাহলে মমতা ব্যানার্জির সর্বনাশ। অনুপ্রবেশকারীরা রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যদি রাজ্যের মুসলমান সম্প্রদায় ক্ষিপ্ত হন, তাহলে তৃণমূলের পক্ষে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে।’