বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতিগুলির মধ্যে আজ ভারতের নাম শীর্ষে। তবে শুধু দ্রুত বৃদ্ধি নয়, এই প্রবৃদ্ধির সুফল যেন সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষের কাছেও পৌঁছায়—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ভারত তার উন্নয়ন কৌশল সাজিয়েছে। আর এই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির মডেলই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য অনুকরণীয় হতে পারে বলে মনে করেন বিদেশ মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব (রাজ্য) অজয় কুমার।
বৃহস্পতিবার অ্যাসোচ্যাম ও বিদেশ মন্ত্রকের কলকাতা শাখা সচিবালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বৈশ্বিক সক্ষমতা তৈরি” শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমেই ভারত এই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ তৈরি করেছে।
অজয় কুমারের কথায়, “আমরা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে চাই যে এই উন্নয়নের ফল সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছেও পৌঁছাক। সেই কারণেই প্রযুক্তিকে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছি।”
ভারত সরকার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, পিএলআই (PLI) স্কিমের মতো একাধিক নীতিগত উদ্যোগ নিয়ে দেশকে একটি শক্তিশালী উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। এর ফলও চোখে পড়ার মতো—মোবাইল ফোন, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল শিল্পে আজ ভারত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। এই সচেতন নীতিগত প্রচেষ্টার ফলেই ভারত আজ দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতির তকমা পেয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, আসিয়ান অঞ্চলের গুরুত্বও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয় এই আলোচনায়। আসিয়ানে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত শ্রীনিবাস গোত্রু বলেন, জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ, দ্রুত নগরায়ণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত গ্রহণ এই অঞ্চলকে ভারতীয় ব্যবসার জন্য দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। তাঁর কথায়, “আসিয়ান আজ বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলির একটি। প্রতি বছর প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এখানে আসে। বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ভারতের উচিত এই অঞ্চলের দিকে আরও গভীরভাবে নজর দেওয়া।”
আসিয়ান-ভারত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আশাবাদী বার্তা দেন তিনি। বর্তমানে পর্যালোচনাধীন এই চুক্তিটি শীঘ্রই চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যাতে বাণিজ্য আরও সহজ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
কাস্টমস সংস্কার প্রসঙ্গে কাস্টমসের প্রধান কমিশনার শ্রীনিবাস নায়েক জানান, গত দুই দশকে নেওয়া একাধিক সংস্কারের ফলে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। “কাস্টমস ২.০ এবং সিঙ্গল উইন্ডো ইন্টারফেসের মতো উদ্যোগের ফলে যেখানে আগে এক সপ্তাহ সময় লাগত, সেখানে এখন তিন দিনের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব,” বলেন তিনি।
ভারত-নেপাল বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন কলকাতায় নিযুক্ত নেপালের কনসাল জেনারেল ঝক্কা প্রসাদ আচার্য। তিনি জানান, নেপালের মোট আমদানি ও রপ্তানির সিংহভাগই ভারতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। “ভারতই একমাত্র দেশ যারা নেপালকে ব্যাপক ট্রানজিট সুবিধা দেয়, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।
সব মিলিয়ে, প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্য সহজীকরণের সমন্বয়ে ভারতের যে উন্নয়ন মডেল, তা আজ শুধু দেশের মধ্যেই নয়—দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু উন্নয়নশীল দেশের কাছেও হয়ে উঠতে পারে এক কার্যকর পথনির্দেশ।