শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন। কাঠমান্ডু।
নেপালের সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে কার্যত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত মিলছে। প্রাথমিক গণনার প্রবণতা বলছে, দেশের রাজনীতিতে প্রবল প্রভাব ফেলছে তরুণ প্রজন্মের উত্থান। বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বলেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)।
রাজনৈতিক মহলের বহু জল্পনাকে উড়িয়ে দিয়ে নেপালের নির্বাচনে যেন দেখা যাচ্ছে এক ধরনের ‘জেন জি সুনামি’। নতুন প্রজন্মের ভোটারদের বড় অংশ দুর্নীতি বিরোধী এবং বিকল্প রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নেপাল নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ১৬৫টি আসনের মধ্যে অন্তত ১০৫টিতে এগিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। ইতিমধ্যেই একটি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে দলটি। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল এবং নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি মিলিয়ে খুব সীমিত আসনে এগিয়ে রয়েছে।
এই ফলাফলের প্রবণতা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নেপালের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্ম বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি তুলেছে।
তরুণ প্রজন্মের ভরসা বলেন্দ্র শাহ
নেপালের রাজনীতিতে বলেন্দ্র শাহ নতুন মুখ নন। কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন সিটির মেয়র হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির এমন সাফল্য অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত।
প্রাথমিক গণনায় দেখা যাচ্ছে, দেশের সাতটি প্রদেশেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে আরএসপি। দলের প্রতীক ‘ঘণ্টা’ ইতিমধ্যেই নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সবচেয়ে আলোচিত লড়াই হচ্ছে ঝাপা-৫ আসনে। সেখানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বলেন্দ্র শাহ। প্রাথমিক গণনার প্রবণতায় এই আসনেও এগিয়ে রয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণই এই সাফল্যের মূল কারণ।
ওলি সরকারের পতনের পটভূমি
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছাত্র-যুবদের নেতৃত্বে নেপালে বড়সড় আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনের জেরে তীব্র চাপের মুখে পড়ে কেপি শর্মা ওলির সরকার। শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়।
এরপর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।
দীর্ঘ আলোচনা এবং রাজনৈতিক দরকষাকষির পর অবশেষে ৫ মার্চ সংসদ নির্বাচনের দিন ঘোষণা করে নেপালের নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার দেশের ১৬৫টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়। নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিল মোট ৬৫টি রাজনৈতিক দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেছিলেন, এবারের নির্বাচনে কোনও দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। কিন্তু প্রাথমিক ফলাফল সেই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
পুরনো রাজনৈতিক শক্তির চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘদিন ধরে নেপালের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে নেপালি কংগ্রেস এবং বিভিন্ন কমিউনিস্ট দল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে মনে হচ্ছে।
প্রাথমিক প্রবণতায় নেপালি কংগ্রেস মাত্র একটি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে সিপিএন-ইউএমএল সাতটি এবং নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি প্রায় নয়টি আসনে এগিয়ে।
এই ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলির প্রতি ভোটারদের আস্থা কিছুটা হলেও কমেছে।
নতুন রাজনীতির বার্তা
নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ছাত্র-যুব আন্দোলনের প্রভাব যে কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা এবার স্পষ্ট হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন বিকল্প নেতৃত্ব এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাইছে।
বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের পরে নতুন রাজনৈতিক দলের উত্থানের চেষ্টা হলেও সেখানে সেই প্রচেষ্টা বড় সাফল্য পায়নি। কিন্তু নেপালে ঠিক উল্টো ছবি দেখা যাচ্ছে।

প্রাথমিক গণনার প্রবণতা যদি চূড়ান্ত ফলাফলেও বজায় থাকে, তবে নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদল হতে পারে। বলেন্দ্র শাহ এবং তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি তখন দেশের ক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাই তৈরি করছে না, বরং নেপালের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তরুণ ভোটারদের এই স্পষ্ট বার্তা ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।