সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কাশ্মীরের পহেলগাঁও কাণ্ডের তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নথিভুক্ত করা শুরু করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। রবিবার পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হামলায় নিহত বিতান অধিকারীর পাটুলির বৈষ্ণবঘাটার বাড়িতে গেল তদন্তকারীদের একটি দল। কথা বলেন তাঁর স্ত্রী এবং পুত্রের সঙ্গে।
স্ত্রী সোহিনী এবং পুত্র হৃদানকে নিয়ে কাশ্মীরে ঘুরতে গিয়েছিলেন বিতান অধিকারী। তিনি কর্মসূত্রে থাকতেন ফ্লোরিডায়। বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত যুবকের স্ত্রী সোহিনীও সেখানেই থাকতেন। গত ৮ এপ্রিল তাঁরা তিন বছরের পুত্রকে নিয়ে কলকাতার বাড়িতে ফিরেছিলেন। গত ১৬ এপ্রিল তিন জনে জম্মু-কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিলেন। কলকাতায় ফেরার কথা ছিল বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল। কিন্তু মঙ্গলবারই পাটুলির বাড়িতে আসে দুঃসংবাদ। জঙ্গিদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার খবর শুনে শোকে পাথর হয়ে যান বিতানের বাবা-মা।
মঙ্গলবার পহেলগাঁওয়ে কী ঘটেছিল, তা জানতেই তৎপর এনআইএ। বুধবারই ঘটনাস্থলে পৌঁছে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন তদন্তকারীরা। শনিবার আনুষ্ঠানিক ভাবে তদন্তভার হাতে নেয় এনআইএ। তাদের বিভিন্ন আধিকারিক নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কথা বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে। সেই মতোই রবিবার দুপুরে এনআইএ-র তিন আধিকারিকের একটি দল বিতানের বাড়িতে যায়।
পহেলগাঁও কাণ্ডে বাংলার আরও দুই বাসিন্দার মৃত্যু হয়। বেহালার বাসিন্দা সমীর গুহ এবং পুরুলিয়ার ঝালদার বাসিন্দা মণীশরঞ্জন মিশ্র। দু’জনেই পরিবার নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। মঙ্গলবার ছিলেন পহেলগাঁওয়ে। শনিবারই সমীরের বেহালার সখেরবাজারের বাড়িতে যায় এনআইএ-র দল। কথা বলেন নিহত সমীরের স্ত্রী শবরী এবং কন্যার সঙ্গে।
বিতান, সমীরের মতো মণীশও স্ত্রী এবং দুই পুত্র-কন্যাকে নিয়ে কাশ্মীর ভ্রমণে গিয়েছিলেন। জঙ্গিদের গুলিতে খুন হন তিনি। সূত্রের খবর, সমীর, বিতানের পর মণীশের পরিবারের সঙ্গে কথা বলবেন এনআইএ আধিকারিকারেরা। তবে কবে তাদের সঙ্গে দেখা করবেন তাঁরা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
জানা গিয়েছে, বিতান অধিকারীর বাড়িতে গিয়ে এনআইএ আধিকারিকরা পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। হামলার সময় বিতানের স্ত্রী যেহেতু ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তাই তাঁর কাছ থেকে ঘটনার চাক্ষুষ বিবরণ সংগ্রহ করাই ছিল এনআইএ-র মূল উদ্দেশ্য। জঙ্গিরা ঠিক কী বলেছিল, তারা কোন দিক থেকে এসেছিল বা কোথায় পালিয়ে যায়, তাদের শারীরিক গঠন বা চেহারা কেমন ছিল- এমনই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নথিভুক্ত করেছেন তদন্তকারীরা। সূত্র বলছে, আজ, রবিবারই সংগৃহীত যাবতীয় তথ্য একত্রিত করে রিপোর্ট তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবেন এনআইএ আধিকারিকরা।
প্রসঙ্গত, বিতান অধিকারীর স্ত্রী এর আগে সংবাদমাধ্যমের কাছে সেই ভয়ংকর রাতের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত লোমহর্ষক। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রথমে গুলির মতো আওয়াজ শুনে তাঁরা আতশবাজি বা সেনার মহড়া ভেবেছিলেন, ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পারেননি। হঠাৎই দেখেন জঙ্গিরা তাঁর শিশু সন্তানকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, বাচ্চাটি ভয়ে চিৎকার করছিল। পেছনে ফিরতেই দেখেন খুব কাছ থেকে একজন ব্যক্তি দৌড়ে এসে তাঁর স্বামীকে গুলি করছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে বিতান লুটিয়ে পড়েন। ভয়ে সকলে একটি জায়গায় জড়ো হয়ে বসেন। ছোট বাচ্চাটি গুলির তীব্র শব্দে ভীত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, “মা ফায়ার… ইটস সো লাউড সাউন্ড…”।

বিতান নিজেও প্রথমে হয়তো বুঝতে পারেননি যে এটি জঙ্গি হামলা ছিল এবং খানিকটা হতচকিত হয়ে গিয়েছিলেন। জঙ্গিরা এসে মুসলিমদের আলাদা করে সরে যেতে বলে এবং হিন্দুদের পরিচয় জানতে চায়। তাঁর স্বামী যখন কথা বলতে গিয়ে আটকে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি স্বামীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যাতে তাঁর কিছু না হয়। কিন্তু তিনি দেখেননি গুলি ঠিক কোথায় লেগেছিল। জঙ্গিরা দুটি গুলি চালিয়েছিল। স্ত্রী চেয়েছিলেন হামলা যেন তাঁর ওপরই হয়, স্বামী বা সন্তানের যেন কিছু না হয়। কিন্তু যখন তিনি সামনে গিয়ে দাঁড়ান, তখন তিনি বুঝতে পারেন জঙ্গিরা বেছে বেছে পুরুষদেরই নিশানা করছে।