সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলা বাংলার মতো চলবে, দিল্লী থেকে কেউ কন্ট্রোল করতে পারবে না। সম্প্রতি দেশের এক বিজেপি শাসিত রাজ্যের বাংলায় কথা বলার অপরাধে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপরে অত্যাচারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এভাবেই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের উদ্দেশ্যে হুংকার দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
জলপাইগুড়ির এবিপিসি ময়দানে সরকারি পরিষেবা বিলি, প্রকল্প উদ্বোধন ও শিলান্যাসের পাশাপাশি বুধবারের সভা থেকে দেশের একের পর এক বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলা বাঙালি শ্রমিকদের ওপরে হেনস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মমতা জানান, ইতিমধ্যেই ২৪ হাজার পরিযায়ী পরিবারকে রাজ্যে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাইরের রাজ্য থেকে দেড় কোটি মানুষ বাংলায় থাকেন, তাঁদের পরিষেবা দিই আমরা। অথচ ডবল ইঞ্জিন সরকার আমাদের ভাইবোনদের মেরে তাড়ায়। অসম থেকে নোটিস পাঠাচ্ছে আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, জলপাইগুড়িতে। বাংলায় কথা বললে আমাদের লোকেদের বাংলাদেশে পুশ করে দিচ্ছে। আমরা মাতৃভাষায় কথা বলব, অন্য ভাষাও শিখব। কোনও ভাষাকে আমরা অসম্মান করি না। কিন্তু তোমরা আমাদের বাংলাকে কন্ট্রোল করতে পারবে না। বাংলা বাংলা চালাবে, দিল্লি নয়। এবার পরিযায়ী শ্রমিকদের সম্মানে আরও একটি পদক্ষেপের কথা জানালেন তিনি৷ বুধবার মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, পরিযায়ী শ্রমিকদের সম্মানে এবার থেকে বিশ্বকর্মা পুজোয় ছুটি থাকবে।
সেইসঙ্গে বিরোধীদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যতদিন রাজনীতি করব, মাথা উঁচু করে করব। পার্লামেন্ট থেকে পেনশন নিলে কয়েক কোটি টাকা হতো। কিসের জন্য আমাকে এত বদনাম করা হবে? আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে লজ্জায় মাথা খারাপ হয়ে পালিয়ে যেত। বাংলা ভালো থাকল দেশ ভালো থাকবে। জয় বাংলা বলব। আমি বাংলা থেকে এসেছি বলে আমাকে প্রতিদিন অপমান করা হয়, কিন্তু আমি তা সহ্য করি কারণ আমি জানি যে আমি যদি আগামীকাল এখানে না থাকতাম, তাহলে চোরেরা সবকিছু চুরি করে নিত। তারা বাংলাকে আরও একটি গুজরাটে পরিণত করবে।
সকলে আধার কার্ড করে নিন
সকলে যেন আধার কার্ড করেন, সেই বার্তাও দিয়ে মমতা বলেন, জেলাশাসককে বলব, আধার কার্ড যাদের নেই দুয়ারে সরকার করে আধার কার্ড করিয়ে দাও। ভোটাধিকার না থাকলে এনআরসি করে দেবে কিন্তু। ভোটার তালিকায় নাম আছে কি না তা আগামী ৬-৭ মাস দেখতে হবে।
জাতপাতের ভাগাভাগি করে যারা দেশের নেতা নয়
প্রধানমন্ত্রীর নাম না করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমার নামে খেলা হবে, আমার নামে স্টেডিয়াম হবে। আমি আমার নামে কিছুই করিনি। মনিষীদের নামে করতে হবে। দেশের নেতা হতে গেলে গান্ধীজির মতো হতে হয়। ওরা বড়দিনের ছুটি পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। বাংলার টাকাও আটকে রাখে, অথচ বলে বাংলা কাজ করে না। দেশের কাণ্ডারী সাধারণ মানুষ। দেশের নেতা মহাত্মা গান্ধী, বাবা সাহেব আম্বেদকর, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসেরা, যাঁরা দেশকে বুঝতেন। জাতপাতের ভাগাভাগি করে যারা, তারা দেশের নেতা নয়।
আরও ২১ হাজার পোস্ট খালি আছে
মমতা বলেন, কোর্টের রায়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আবার শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি-এর নোটিফিকেশন হয়েছে। বাদবাকি যা আছে, আইনের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে। আইনের জটিলতা কেটে গেলে আমরা আইন মেনেই চেষ্টা করব সঙ্গে থাকার। ৩৫ হাজার পোস্টের জন্য বিজ্ঞাপন আমরা দিয়েছি, আরও ২১ হাজার পোস্ট খালি আছে। এটা হয়ে গেলে বাকিটা আমরা আবার দেখে দেবো। কী করবেন, যখনই শিক্ষক নিয়োগ করতে যাচ্ছেন, কোর্টে জনস্বার্থের মামলা করে দিচ্ছে, আটকে যাচ্ছে। আমি তো চাকরি দিতে চাই। কোর্টে গিয়ে আটকে দিচ্ছ কেন?

জগন্নাথ ধামের আদলে দুর্গা অঙ্গন
২০২৪ সালে ১৯ কোটি পর্যটক বাংলায় এসেছেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, সারা পৃথিবী এখন অশান্তির আগুনে জ্বলছে। পর্যটকদের যাওয়ার জায়গাও নেই। আমরা শান্তির পক্ষে। আমাদের এই অশান্তি দেখতে ভালো লাগে না। জগন্নাথ ধামের মতো করেই দুর্গা অঙ্গন তৈরি হবে।
ডিভিসি-র ভূমিকার নিন্দা
বন্যা পরিস্থিতি ও উত্তরবঙ্গের জল সমস্যার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, দক্ষিণবঙ্গে ডিভিসি আর উত্তরবঙ্গে ভুটান জল ছাড়ে। আমরা ডুবব আর ওরা জল ছাড়বে এটা হতে পারে না। কেন্দ্রকে ইতিমধ্যেই অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে ইন্দো-ভুটান রিভার কমিশনে পশ্চিমবঙ্গকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ বার বর্ষা অত্যন্ত বেশি হচ্ছে। ডিভিসি অকারণে জল ছাড়ায় দক্ষিণবঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঞ্চেত, মাইথনের জল ছাড়ায় ক্ষতি হয়। আমরা ভারত সরকারকে বলেছি, ইন্দো-ভুটান রিভার কমিশনে পশ্চিমবাংলাকে সদস্য করা হোক। যাতে আমরা সমন্বয় রাখতে পারি। আমরা শুধু জল নেব, আমরা ডুবব, ওরা জল ছাড়বে? ওরা আমাদের বন্ধু দেশ। উভয়ে কিছু ব্যবস্থা করতে পারি যাতে ওরাও ভালো থাকে, আমরাও ভালো থাকি। প্রতিবেশীরা ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকি।
দিল্লির দয়া ভিক্ষা চাই না
বাংলার বাড়ি-সহ একাধিক প্রকল্পের টাকা আটকে রাখা নিয়েও এ দিন কেন্দ্র সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, টাকা আটকে রেখে দিয়েছে দিল্লি, বাংলাকে বঞ্চনা করা হচ্ছে সব ক্ষেত্রে, বাংলার বাড়ি মানুষ কেন পাবে তা বলার অধিকার তোমাদের নেই। আগে ৪৭ লক্ষ করে দিয়েছি। ১২ লক্ষ এ বছর করা হয়েছে, ১৬ লক্ষ ডিসেম্বরে প্রথম ফেজ় পাবে। মে-জুনে সেকেন্ড ফেজ়। যা বাকি থাকবে ফেজ় ধরে করে দেবো। দিল্লিকে বলব, তোমাদের দয়া, ভিক্ষা চাই না। আমরা মাথা নত করতে শিখিনি।
উত্তরবঙ্গে বিজয়া সম্মেলনী
মমতা বলেন, পুজোর পরে উত্তরবঙ্গে এসে বিজয়া সম্মিলনী করার চেষ্টা করব। মানুষের মুখে হাসি দেখতে পেলেই আমার ভালো লাগে।
উত্তরবঙ্গে উন্নয়নের খতিয়ান
এদিনের বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, ২০১১ সাল থেকে, আমরা ৬.৫৬ লক্ষ পাট্টা দিয়েছি। এর মধ্যে ৩.১৭ লক্ষ গৃহপাট্টা, ১.৯৩ লক্ষ কৃষি পাট্টা, ৫৯,০০০ শরণার্থী পাট্টা, ৪৭,০০০ বনপাট্টা এবং ৩৯,০০০ চা বাগানের পাট্টা। ২৪ আগস্ট, আমরা উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে ৭,০০০ এরও বেশি পাট্টা বিতরণ করেছি। আজ, আমরা ১১,৬০০ পাট্টা দিচ্ছি।