সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
রাত পোহালেই মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে শুরু হচ্ছে দেবী পক্ষের। সারা বছর ধরে প্রতীক্ষার পরে মর্তে আসছেন মা দুর্গা। গত কয়েক বছর ধরেই দুর্গাপুজো এগিয়ে আসতে আসতে মহালয়া থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ঠাকুর দেখা। আর এবারে মহালয়ার আগের দিনেই বৃষ্টিমুখর কলকাতার রাস্তায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেরিয়ে পড়লেন পূজো উদ্বোধনে। যদিও মমতার কথায়, পূজো উদ্বোধন নয় মন্ডপ উদ্বোধন করছেন তিনি। শনিবার মহালয়ার আগের দিনে ই উত্তর কলকাতার তিন তিনটি বড় পূজোর মন্ডপ একরকম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেই দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে।
উত্তর কলকাতার বড় পুজোর তালিকায় একেবারে প্রথম সারিতেই আসে টালা প্রত্যয়, হাতিবাগান সার্বজনীন এবং দমকল মন্ত্রী সুজিত বসুর শ্রীভূমি স্পোর্টিং দুর্গাপুজো। আজ এই তিন দুর্গাপুজোতেই মন্ডপ উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বলেন, মহালয়ার আগে আমি কোনও পুজোর উদ্বোধন করি না। আজ আমি প্যান্ডেল উদ্বোধন করতে এসেছি। এদিন হাতিবাগানে মুখ্যমন্ত্রী নিজেও জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে প্রায় তিন হাজার পুজোর উদ্বোধন করবেন তিনি।
শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব
শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের মণ্ডপ উদ্বোধনও করলেন মুখ্যমন্ত্রী। মন্ত্রী সুজিত বোস বলেন, আমাদের পুজোর উৎসব উৎসারিত সূচনা নামটি মুখ্যমন্ত্রীই দিয়েছেন। তিনি এই সূচনা করার পরেই তাঁর নির্দেশ মেনে কাল থেকে মণ্ডপ খুলে দেওয়া হবে। এখানে আলোকসজ্জায় তুলে ধরা হয়েছে দিঘার জগন্নাথ মন্দির থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন মন্দির। মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, রথীন ঘোষ, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে বিধায়ক, কাউন্সিলররা হাজির ছিলেন শ্রীভূমিতে। সংগীত পরিবেশন করেন নচিকেতা ও অদিতি মুন্সী। ভিনরাজ্যে বাঙালিদের উপর অত্যাচারের প্রসঙ্গ এদিন উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, আমরা একজোট না থাকলে দেশটাই টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আমরা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে বিশ্বাসী।
হাতিবাগান সার্বজনীন দুর্গোৎসব
শনিবার হাতিবাগান সর্বজনীন পুজোর প্যান্ডেল উদ্বোধন করলেন তিনি। মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, মহালয়া থেকেই মাতৃমূর্তির উদ্বোধন করেন, তার আগে কেবল প্যান্ডেলের উদ্বোধন হয়। এদিন বৃষ্টি মাথায় নিয়েই হাতিবাগান সর্বজনীনের পুজো প্যান্ডেলে পৌঁছান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিধায়ক অতীন ঘোষও। উদ্বোধনের আগেই তাঁকে বলতে শোনা যায়, আমি কেবল মণ্ডলের উদ্বোধন করছি। এরপর মঞ্চে উঠে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকলকে শারদ শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আগামিকাল মহালয়ার তর্পণ হবে। মহালয়ার আগে আমি মাতৃমূর্তি উদ্বোধন করি না। আজকে আমি প্যান্ডেল উদ্বোধন হিসেবে এসেছি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, তাঁর টনসিল ফুলেছে। সে কারণে রিস্ক না নিয়ে কান, মাথা, গলা কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বৃষ্টিতে ভিজবেন না। ইনফ্লুয়েঞ্জাও হচ্ছে। পুজো সকলের ভালো কাটুক, সেই প্রার্থনাও করেন মমতা।
টালা প্রত্যয়
হাতিবাগানের পর মুখ্যমন্ত্রী পৌঁছন টালা প্রত্যয় দূর্গা পূজার মণ্ডপে। এর পাশাপাশি পুজো প্যান্ডেলে মাঝে-মাঝে বাংলা গান বাজানোরও আর্জি জানান তিনি।
চলতি বছর টালা প্রত্যয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার টালার থিম সং লিখেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ভাবনাতেও এবার তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনা যখন, তখন তা অনন্য তো হবেই। মা দুর্গা এবার টালাতে অসুরদলনী নন। এখানের তিনি গরীব চাষীর ঘরের কন্যা। ভারত তো নদীমাতৃক দেশ। কৃষিপ্রধান দেশে বীজই তো আসল বিষয়। সভ্যতার উৎস ভূমি। ছোট্ট বীজের থেকে জন্ম হয় অরণ্যভূমির। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার কৃষি বিল এনেছেন। এর ফলে কৃষিজমির অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে, ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক বঞ্চিত। ফলে মা দুর্গা নিজেই জমিকর্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাই নিজেই লাঙল ধরেছেন। পদতলে মহিষ নেই, বদলে আছে ইউরিয়ার বস্তা। তাঁকেই বোধ করছেন মা। ইউরিয়ার বস্তা থেকে বেরিয়ে আসছে কৃষক স্বার্থ বিরোধী কৃষি বিল।

এই পুজোর এবার ১০০ বছর। ধনধান্যে ভরে, মা এসেছেন ভোরে- এই পুজোর থিম সং লিখেছেন এবং সুর দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গেয়েছেন ইন্দ্রনীল সেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যাঁরা কৃষিকাজ করেন, শস্য উৎপাদন করেন তাঁদের অনেকে ভুলে যান। কিন্তু তাঁরা ছাড়া আমরা খেতে পারব না, বাঁচব না। তাঁদের মনে রেখে টালা প্রত্যয়ের থিমে কৃষকদের শস্য ভাণ্ডারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এ জন্য তাঁদের ধন্যবাদ। মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের পুজোর থিম সংও যে এবার তিনিই রচনা করেছেন, সে কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। বাংলা গানের সোনালি দিন মনে করাতে এবারেও মুখ্যমন্ত্রীর ভাবনামতো অনুরোধের আসরে গান গেয়েছেন প্রখ্যাত শিল্পীরা।