শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
কেউ টিকিট কেটেছিলেন ১০০০০ টাকা দিয়ে। আবার কেউবা টিকেট কেটেছিলেন ১ লক্ষ টাকা দিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টাইন মহা তারকা তথা ফুটবলের রাজপুত্র লিওনেল মেসিকে নিজের চোখে ফুটবলে কিক মারতে দেখবেন কলকাতার যুবভারতী স্টেডিয়ামে। কিন্তু ফুটবলের রাজপুত্রের পায়ে ফুটবল পৌঁছানোর আগেই মেসিকে ঘিরে ফেললেন বাংলার নেতা-মন্ত্রীরা। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বলিউড বাদশা শাহরুখ খান মাঠে পৌঁছানোর আগেই মেসির সঙ্গে সেলফি তোলার লগে তৃণমূলের দাপুটে নেতা সুজিত ঘোষ থেকে শুরু করে রাজ্যের ক্রীড়া মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং তৃণমূল বিধায়ক রাজ চক্রবর্তীর স্ত্রী তথা টলিউড অভিনেত্রী শুভশ্রী যেভাবে মেসিকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে নিলেন তাতে মেসি দর্শন আর হলো না রাত জেগে স্টেডিয়ামে লাইন দিয়ে ঢোকা প্রায় ৯০ হাজার দর্শকের।
বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার লিওলেন মেসির কলকাতা সফর ঘিরে কয়েক মাস আগে থেকেই উন্মাদনায় ফুটছিল তিলোত্তমা। যুবভারতী স্টেডিয়ামে মেসিকে একটিবার দেখার জন্য কয়েক হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছিল সকলে। শনিবার যুবভারতীতে মেসির গাড়ি প্রবেশের পরই ‘মেসিম্যানিয়া’র উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে গ্যালারি। এরপর দর্শকদের একাংশের উদ্দেশে অভিবাদন জানান ফুটবলের রাজপুত্র। কিন্তু হঠাৎ দেখা যায় স্টেডিয়ামের একদিক থেকে বোতল উড়ে আসছে। কারণ আর কিছুই নয় টিভির দৌলতে গত প্রায় দেড় দশক ধরে মেসিকে কয়েক লক্ষ বার দেখা হয়ে যাওয়ায় আর স্টেডিয়ামের জায়েন্ট স্ক্রিনে মেসিকে দেখে সন্তুষ্ট নয় দর্শকরা। মেসির চারদিকে তখন ঘিরে রয়েছেন শুভশ্রী অরূপ বিশ্বাস সুজিত বোস সহ তৃণমূলের দাপুটে নেতা-মন্ত্রীরা এবং মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তর ঘনিষ্ঠ লোকজন। বাইনোকুলার দিয়েও স্টেডিয়ামের মাঠে মেসিকে না দেখতে পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন দর্শকরা। সেই সঙ্গেই যুবভারতী স্টেডিয়ামের ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল বাংলা তথা ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসে এক লজ্জাজনক অধ্যায়। রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে যুবভারতী স্টেডিয়াম। সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান মেসি। ফুটবলের রাজপুত্র মাঠ ছাড়তেই দর্শকের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙে। মাঠের ব্যারিকেড ভেঙে ঢুকে পড়েন উন্মত্ত জনতা। গ্যালারির সিট ভেঙে ছুড়ে ফেলতে থাকেন মাঠের ভিতরে। ভেঙে দেওয়া হয় প্লেয়ারদের টানেল, ক্যানোপি।
লন্ডভন্ড হল শহরের বৃহত্তম ফুটবল স্টেডিয়াম যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। হাজার হাজার দর্শকের ক্ষোভ আছড়ে পড়ল সল্টলেক স্টেডিয়াম এবং লাগোয়া এলাকায়। তুমুল বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে মাঝপথ থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যেতে হল মুখ্যমন্ত্রীকে। এ ঘটনা নজিরবিহীন। প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থনাও করতে হল তাঁকে। এমন ঘটনাও সাম্প্রতিক কালে ঘটেছে কি না, কেউ মনে করতে পারছেন না। মেসির সঙ্গে যাঁর মাঠে আসার কথা ছিল, সেই শাহরুখ খান হোটেল থেকেই ফিরে গেলেন।
তদন্ত কমিটি গঠন মমতার
যুবভারতীতে মেসি থাকতে পেরেছেন সাকুল্যে ১৬ থেকে ১৮ মিনিট। কিছু ক্ষণ মাঠে ঘোরাফেরা করার পরেই তাঁকে বেরিয়ে যেতে হয়। অনেকের দাবি, দর্শকদের ক্ষোভ এবং ক্রোধের আঁচ পেয়েই তড়িঘড়়ি মাঠ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল মেসিকে। নির্ধারিত সময়সূচি বলেছিল, মেসি আরও বেশ কিছু ক্ষণ যুবভারতীতে থাকবেন। তাঁর সঙ্গে একই মঞ্চে থাকার কথা ছিল মমতা, শাহরুখ খান এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের। বেলা ১২টা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী মমতার পৌঁছোনোর কথা ছিল যুবভারতীতে। পরিস্থিতি দেখে মমতা আর মাঠের দিকে এগোননি। মাঝপথ থেকে তিনি ফিরে যান। মাঝ রাস্তা থেকে ফিরে যাওয়ার পরেই এই লজ্জাজনক ঘটনার জন্য লিওনেল মেসি এবং দর্শকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আজ সল্টলেক স্টেডিয়ামে যে চরম অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে, তাতে আমি গভীরভাবে বিচলিত ও মর্মাহত। হাজার হাজার ক্রীড়াপ্রেমী ও সমর্থকের সঙ্গে আমিও অনুষ্ঠানে যোগ দিতে স্টেডিয়ামের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম-যাঁরা তাঁদের প্রিয় ফুটবলার লিওনেল মেসির এক ঝলক দেখার আশায় সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্য আমি লিওনেল মেসির কাছে, পাশাপাশি সমস্ত ক্রীড়াপ্রেমী ও তাঁর অনুরাগীদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আশিস কুমার রায়ের সভাপতিত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেন মুখ্য সচিব এবং স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব। এই কমিটি ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করবে, দায়িত্ব নির্ধারণ করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে।
আরও একবার, সমস্ত ক্রীড়াপ্রেমীর কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’
কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস পুলিশের
শনিবার বিকেলের সাংবাদিক বৈঠকে রাজীব কুমার জানান, ‘এই ধরনের বড় ইভেন্টে যে ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন, তা ছিল না। আয়োজকদের গাফিলতির কারণেই পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূল আয়োজককে আটক করা হয়েছে। তাঁরা লিখিতভাবে জানাবেন কীভাবে দর্শকদের টাকা ফেরত বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। তদন্ত শেষ হলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ পুলিশ সূত্রে খবর, ভিড়ের অনুমান, টিকিট বিক্রির সংখ্যা ও স্টেডিয়ামের বাস্তব ক্ষমতার মধ্যে বড় ফারাক ছিল। নিরাপত্তা পরিকল্পনাতেও একাধিক ত্রুটি ধরা পড়েছে। কোন পর্যায়ে কত দর্শক মাঠে প্রবেশ করবেন, মেসির চলাচলের রুট— এই সব বিষয়ে সমন্বয়ের অভাব ছিল বলেই প্রাথমিকভাবে মনে করছে প্রশাসন। এদিকে, টিকিট কেটে মাঠে ঢুকে মেসিকে দেখতে না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ দর্শকদের বড় অংশ। অনেকেই প্রকাশ্যে ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছেন। রাজ্য পুলিশের বক্তব্যে সেই দাবিরই আংশিক প্রতিফলন মিলল। মেসির ভারত সফরের পরবর্তী পর্ব হায়দরাবাদ ও দিল্লিতে। কিন্তু কলকাতার এই বিশৃঙ্খলা গোটা ‘গোট ট্যুর’-কে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল। এখন দেখার—তদন্তের পর দায় কার ঘাড়ে কতটা এসে পড়ে, আর ক্ষতিপূরণ বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়। এরপরেই বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয় মেসির কলকাতা শহরের মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে।

রয়ে গেল একগুচ্ছ প্রশ্ন
পুলিশের সামনেই কীভাবে যুবভারতীতে বিশৃঙ্খলা? বিধাননগর পুলিশের আশ্বাসের পরও মাঠে কীভাবে ঢুকল জলের বোতল? কীভাবে মাঠে ঢুকল জলের বোতল? কীভাবে বিকোল ১৫গুণ বেশি দামে? পুলিশ কী করছিল? এত বড় গন্ডগোল কেন আটকাতে পারল না পুলিশ? পুলিশ কি প্রস্তুত ছিল না? কী করছিলেন উদ্যোক্তারা? ভিড় হবে জেনেও কেন প্রস্তুতি ছিল না? বিশৃঙ্খলার শুরুতেই কেন ব্যবস্থা নিল না পুলিশ? এই প্রশ্ন উঠছে।

বিজেপির বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তৃণমূলের
যুবভারতী স্টেডিয়ামে এদিনের অশান্তির পিছনে বিজেপির একাংশ রয়েছে বলে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূলের অন্যতম রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষ। হাতে গেরুয়া পতাকা, কণ্ঠে জয় শ্রীরাম ধ্বনি। স্লোগান দিতে দিতে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের ব্যারিকেড ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়ছে উন্মত্ত জনতা। শনিবারের এই দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে নেটদুনিয়ায়। গোটা বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে তৃণমূলের অন্যতম রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ। তাণ্ডবের সময়ই দেখা যায়, জয় শ্রীরাম লেখা গেরুয়া পতাকা নিয়ে মাঠে ঢুকছেন একদল উন্মত্ত জনতা।
জয় শ্রীরাম স্লোগানও শোনা যায় তাদের মুখে। সেই দৃশ্য দেখেই সুর চড়িয়েছেন কুণাল। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘আজ আমরা দেখেছি বিজেপি-সমর্থিত দুষ্কৃতীরা মাঠে ঢুকে উসকানি দিতে ও অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। তারা গেরুয়া পতাকা বহন করছিল এবং স্লোগান দিচ্ছিল। দর্শকদের ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে এরা বিশৃঙ্খলা করছিল। শকুনের রাজনীতি করেছে। বাংলা-বিরোধী বিজেপি বাংলাকে বদনাম করতে যেকোনও সীমা ছাড়াতে পারে। পুলিশের উচিত এই ধরনের অসামাজিক তৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা।’