শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
১০০ দিনের কাজের প্রকল্প থেকে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর নাম সরানোর প্রতিবাদে সংসদের সিঁড়িতে রাত জেগে ধর্নায় বসল তৃণমূল কংগ্রেস। শীতের কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে কম্বল পেতে, হাতে প্ল্যাকার্ড আর বাংলার মনীষীদের ছবি নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হলেন তৃণমূলের সাংসদরা। এই প্রতিবাদে শামিল হয়ে কেন্দ্রকে কড়া বার্তা দিলেন সমাজবাদী পার্টির সাংসদ জয়া বচ্চন। তাঁর কণ্ঠে উঠে এল বাংলার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় বিশ্বাসের কথা।
সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে বিরোধীদের যাবতীয় আপত্তি উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় সরকার মনরেগা বা ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর নাম বাদ দিয়ে সেখানে রাম নাম যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছে রাজ্যের শাসক দল। এই সিদ্ধান্তকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং ইতিহাস ও আদর্শের উপর আঘাত বলেই দেখছে তৃণমূল।
এর আগের দিনই বাংলায় শিল্প সম্মেলনের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মহাত্মা গান্ধীর প্রতি সম্মান জানিয়েই বাংলার সরকারের প্রকল্পের নামকরণ করা হয়েছে এবং তা নিয়ে কোনও আপস হবে না। মমতার এই অবস্থানের পরই সংসদের সিঁড়িতে রাতভর প্রতীকী প্রতিবাদে বসেন তৃণমূলের সাংসদরা।
রাতভর এই ধর্না শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না, ছিল এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদও। মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত-সহ বাংলার মনীষীদের ছবি সামনে রেখে কখনও রবীন্দ্রসংগীত, কখনও নজরুলগীতিতে সুর মিলিয়ে প্রতিবাদ জানান তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, সাগরিকা ঘোষ, মৌসম বেনজির নূর ও সাকেত গোখলরা। তাঁদের বার্তা ছিল স্পষ্ট—বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আদর্শকে অস্বীকার করা যাবে না।
পরের দিন সংসদের অধিবেশন শুরু হলে তৃণমূলের এই ধর্না মঞ্চে একে একে যোগ দেন ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলের সাংসদরা। সমাজবাদী পার্টি, কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি ও শিবসেনার প্রতিনিধিরা বাংলার প্রাপ্য বকেয়া অর্থ আদায় এবং বাংলার মনীষীদের অপমানের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানান। এই উপস্থিতি ইন্ডিয়া জোটের রাজনৈতিক সংহতি ও শক্তির বার্তা হিসেবেই ধরা পড়ে।
এই প্রতিবাদে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে জয়া বচ্চনের উপস্থিতি। সংসদ চত্বরে তৃণমূলের ধর্না মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু রাজনৈতিক সমর্থনই জানাননি, বরং রবীন্দ্রসংগীতে সুর মিলিয়ে বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে নিজের আত্মিক সম্পর্কও তুলে ধরেন। জয়া বচ্চন বলেন, “বাঙালি মনীষীদের অপমান করে এবং গায়ের জোরে আইন পাস করিয়ে বাংলার কণ্ঠরোধ করা যাবে না। যত অপমান করা হবে, বাংলার মানুষের মনোবল তত বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, বাংলার মানুষ সব সময়ই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগে ভাবে। গোপালকৃষ্ণ গোখলের বিখ্যাত উক্তি ‘What Bengal thinks today, India thinks tomorrow’-এর প্রসঙ্গ টেনে জয়া বচ্চন বলেন, দেশের যে কোনও বড় নীতি বা সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত আগে বাংলাই দেয়। সেই সঙ্গে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে তাঁর আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য, “বাংলার মানুষ জানে কাদের হাতে রাজ্যের শাসন নিরাপদ। তাই আমি নিশ্চিত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবেন।”

সংসদের সিঁড়িতে এই রাতভর প্রতিবাদ শুধু একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ নয়, বরং বাংলার আত্মসম্মান, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার এক শক্তিশালী বার্তা হিসেবেই রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।