সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘বিজেপিকে একটা সুযোগ দিন। ডবল ইঞ্জিন সরকার গড়তে দিন, দেখুন কত দ্রুত উন্নয়ন হয়। ত্রিপুরা দেখুন, সেখানে কমিউনিস্ট, বামপন্থীরা ৩০ বছর বরবাদ করেছিল। ত্রিপুরাবাসী আমাদের সুযোগ দিয়েছে। আমরা উন্নয়ন করেছি।’ এভাবেই শনিবার বাংলায় এসে আগামী বছর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় সরকার পরিবর্তনের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
খারাপ আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতার সমস্যার কারণে নদিয়ার তাহেরপুরে নামতে পারেনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হেলিকপ্টার। নিরাপত্তাজনিত কারণে শেষ পর্যন্ত হেলিকপ্টারটি ঘুরিয়ে কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর কলকাতা থেকেই ভার্চুয়ালি তাহেরপুরে নির্ধারিত জনসভায় বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজের বক্তব্য শুরু করেন ‘জয় নিতাই’ বলে। এরপরেই তিনি সভায় অনুপস্থিত থাকার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন। তিনি বলেন, ‘আমি ক্ষমা প্রার্থী। আবহাওয়া খারাপের কারণে আমি আপনাদের কাছে পৌঁছাতে পারলাম না। টেলিফোনের মাধ্যমে আমি আপনাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি।’
প্রসঙ্গত বিশেষ বিমানে শনিবার সকাল ১০টা ৩৩ মিনিটে কলকাতা বিমানবন্দরে নামেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। সেখানে তাঁকে রাজ্যের তরফে স্বাগত জানান মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ। তারপর সকাল ১১টা ১৫মিনিট নাগাদ কলকাতা থেকে হেলিকপ্টারে করে তাহেরপুরের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি৷ কিন্তু, ঘন কুয়াশার কারণে রানাঘাটের হেলিপ্যাডে নামতে পারেনি মোদির কপ্টার৷ ফিরিয়ে আনা হয় কলকাতায়৷ এরপরেই তাহেরপুরের সভায় উপস্থিত বিজেপি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভার্চুয়াল ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ভার্চুয়াল ভাষণে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন ইস্যুকে সামনে রেখে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। মোদী বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে একবার বিজেপির ডাবল ইঞ্জিন সরকার বানিয়ে দেখুন। অনুপ্রবেশকারীরা তৃণমূলের স্নেহধন্য। বহু অনুপ্রবেশকারীকে বাঁচাতেই পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর-এর বিরোধিতা করছে তৃণমূল।’ এরপরেই তিনি বলেন, ‘বাংলার এমন সরকার দরকার, যারা দ্রুত গতিতে উন্নয়ন করবে। যখন ওখানে নিজে যাব, আরও কথা বলব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বামেদের সব খারাপ অর্জন এখন তৃণমূলের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। রাজ্যের সাধারণ মানুষের স্বপ্নভঙ্গ করা উচিত নয়। আমার বিরোধিতা করুক তৃণমূল, কিন্তু উন্নয়ন কেন আটকে রাখা হচ্ছে? হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প রাজ্যে আটকে রয়েছে। একবার বাংলায় বিজেপিকে সুযোগ দিন। ডাবল ইঞ্জিন সরকার গড়ে দ্রুত উন্নয়ন করা হবে। বঙ্গবাসীর স্বপ্ন পূরণে আমরা সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করব।’ তৃণমূলকে উন্নয়ন বিরোধী সরকার বলে আক্রমণ শানান তিনি। বলেন, ‘তৃণমূল মোদির বিরোধিতা করবে, ১০০ বার তা করুক। কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নকে তারা কেন আটকে রাখছে? এ-রাজ্যের সাধারণ মানুষের স্বপ্নভঙ্গ করার কাজ যেন তারা না করে।’তিনি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বারবার একবার সুযোগের প্রার্থনা করেন।
মতুয়া প্রশ্নে নিরব মোদী
এসআইআর প্রক্রিয়ায় খসড়া তালিকা প্রকাশের পরই দেখা গিয়েছে, সবথেকে বেশি নাম বাদ গিয়েছে মতুয়া প্রভাবিত বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতেই। শুধুমাত্র রানাঘাট উত্তর-পূর্ব ও রানাঘাট দক্ষিণেই ৪২ হাজার মতুয়ার নাম বাদ পড়ায় চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। ফের উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা ঘিরে ধরেছে সেখানকার মানুষদের। আর এতেই মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে আশঙ্কার মেঘ বঙ্গ বিজেপির ঘরে! এই অবস্থায় আজ শনিবার মোদির সভাকে ঘিরে বাড়ছিল ক্রমশ প্রত্যাশার পারদ। হাজার হাজার মতুয়া আশায় ছিলেন, নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও বড় ঘোষণা করতে পারেন মোদি। কিন্তু তাহেরপুরে দেওয়া ভার্চুয়াল ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সে পথে হাঁটলেন না! প্রধানমন্ত্রীর সভার শেষ হওয়ার পরেই কুণাল ঘোষ বলেন, ‘এসআইআর নামক বিজেপি প্রভাবিত নির্বাচন কমিশনের হঠকারিতায় যারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন, তাঁদের জন্য বার্তা দিতে পারতেন। কিন্তু তাঁর কাছে কোনও বার্তা নেই।’ যদিও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, ‘উনি বলেছেন সবার সঙ্গে থাকবেন। কারোর নাগরিকত্ব যাবে না।’

গঙ্গা বিহার থেকে প্রবাহিত হয় বাংলায়
এইদিনের টেলিফোনের বার্তায় ঘুরে ফিরে আসে মোদির গঙ্গা প্রবাহের প্রসঙ্গও। এই বিষয়ে তিনি জানান, গঙ্গা যেমন বিহার থেকে বাংলায় প্রবাহিত হয়েছে। তেমনই বিহারের জনাদেশে এনডিএ সরকার গঠিত হয়েছে। সেভাবেই পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি সরকার গঠন হবে। এই প্রসঙ্গে মোদি বলেন, ‘কিছু দিন আগে জিএসটি বাঁচানোর পদক্ষেপ করা হয়েছে। রাজ্যে দু’টি বড় সড়ক প্রকল্প হয়েছে। তাতে সংযোগ বেড়েছে। গত মাসে বিহারে এনডিএ সরকার জনাদেশ পেয়েছে। তার পরে বলেছিলাম, গঙ্গাজি বিহার থেকে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গায় পৌঁছোয়। গঙ্গা বাংলাতেও বিজেপির জয়ের রাস্তা তৈরি করেছে।’ বিহারে বিজেপির সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে মোদি বলেন, ‘বিহারে বিপুল জয় পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পথ খুলে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও জঙ্গলরাজের অবসান হবে। বাংলার গলি-গলিতে আজ আওয়াজ উঠছে, ‘বাঁচতে চাই বিজেপি তাই’।’
ভাষণের শেষে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে মোদী বলেন, ‘ভারত পরাধীন থাকার সময় বঙ্কিমচন্দ্র ‘বন্দে মাতরম’ রচনা করে গোটা দেশকে এক করেছিলেন।’