সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে। কারও জমি কেড়ে নয়।’ এভাবেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সিঙ্গুর সফরের ১০ দিনের মাথায় সেই সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে বাংলার শিল্পায়ন এবং কৃষি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার রতনপুরের ইন্দ্রখালির মাঠে সরকারি সভা থেকে জানালেন, কৃষিজমি দখল নয়, কৃষির সঙ্গে সহাবস্থান করেই শিল্প, এই নীতিতেই এগোচ্ছে রাজ্য সরকার।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সিঙ্গুরে ৮ একর জমির উপর ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে সিঙ্গুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। সেখানে ২৮টি প্লটের মধ্যে ইতিমধ্যেই ২৫টি বরাদ্দ হয়ে গিয়েছে।’ এর পাশাপাশি সিঙ্গুরে ৭৭ একর জমিতে একটি প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্ট সেখানে ওয়্যারহাউস তৈরি করছে। মমতা বলেন, ‘হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আমরা মুখে বলি না, কাজে করি।’
গত ১৮ জানুয়ারি এই সিঙ্গুরেই সভা করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিজেপির অনেকেই আশা করেছিলেন, সিঙ্গুরের মাটি থেকে শিল্প নিয়ে কোনও বার্তা দেবেন মোদী। তবে বাস্তবে সিঙ্গুরের মাটি থেকে শিল্প নিয়ে কোনও কথা শোনা যায়নি মোদীর মুখে। পরিবর্তে তৃণমূলের রাজত্বে বাংলায় ‘জঙ্গল-রাজ’ চলছে বলে সরব হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এদিনের সভা থেকে যার জবাবে মমতা নিজের জমি আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘সিঙ্গুরের জমি ফিরিয়ে না দিলে আমি নিজেকে বাজি রেখেছিলাম। মরার জন্য তৈরি ছিলাম। কথা দিয়েছিলাম, কথা রেখেছি। জমি ফিরিয়ে দিয়েছি।’ এরপরই মোদীকে নিশানা করে বলেন, ‘তোমরা কী করেছো,শুধু মুখে বড় বড় বুলি? তারকেশ্বর-বিষ্ণুপুর লাইন, আমি করে গিয়েছিলাম আর ওরা ফিতে কেটেছে। এর বেশি কিছু নয়।এই বুলি চলবে না বাংলায়।’ প্রসঙ্গত ১৮ তারিখ প্রধানমন্ত্রী এই সিঙ্গুরের সভা থেকেই রেলের ওই প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন।

মোদীকে নিশানা করে কটাক্ষের সুরে মমতা এও বলেন, ‘আমাদের সব টাকা বন্ধ করে দিয়েছো আর সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে বলছো আমি বাংলার জন্য সব করবো? হিন্দিতে বাংলা লিখে নিয়ে আসেন আর দেখাতে চান কত বড় বাংলা প্রেমী!’
নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘আমি মরে যাব, কিন্তু আমার কথার দাম আছে। কথা দিলে ১০০ শতাংশ রাখি। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের মতো জুমলা করি না। আমাদের সরকার মানুষের সরকার।’
সিঙ্গুরের সঙ্গে নিজের আন্দোলনের স্মৃতিও তুলে ধরেন মমতা। বলেন, ‘সিঙ্গুর আমার ফেভারিট জায়গা, ২০০৬ থেকে ২০০৮ আমি সিঙ্গুরের রাস্তায় পড়ে থেকেছি। ২৬ দিন অনশন করেছি। তখন অনেকেই আমাদের খাবার দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। আপনারাই আমার প্রেরণা।’
বাংলার বাড়ি প্রকল্প
এদিনের সভা থেকে রাজ্যের ২০ লক্ষ উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে ‘বাংলার বাড়ি (গ্রামীণ)-২’ প্রকল্পের প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। এই প্রকল্পে রাজ্যের মোট ব্যয় হবে ২৪ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘দু’মাসে ৩২ লক্ষকে টাকা দিয়েছি। আগে ১২ লক্ষ পেয়েছিলেন। আজ আরও ২০ লক্ষ মানুষের অ্যাকাউন্টে প্রথম কিস্তি যাচ্ছে।’ এখানে সমস্ত জেলা মিলিয়ে মোট ১৬৯৪টি পরিষেবা উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে। যার জন্য মোট খরচ হয়েছে ৩৩ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। বাংলার বাড়ি আগেও ১ কোটি করেছি। কিছুদিন আগেও ১২ লক্ষ পরিবারকে দিয়েছি, আজ ২০ লক্ষ মানুষের কাছে ব্যাঙ্কে টাকা পৌঁছে যাবে। মানে ২ মাসে সংখ্যাটা ৩২ লক্ষ! কেন্দ্র এক পয়সাও দেয় না। বাকি যা থাকবে, আগামী দিনে দফায় দফায় হবে। দুর্যোগে যাঁদের বাড়ি ভেঙেছে, তাঁদের করে দিয়েছি। বাংলার বাড়ি প্রকল্পে দেওয়া হল ২৪ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী ১০৭৭টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন, যার আর্থিক মূল্য ৫৬৯৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৬১৬টি প্রকল্পের শিলান্যাস হয়, যার ব্যয় ২১৮৩ কোটি টাকা।
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের শিলান্যাস
এদিনই ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘাটাল প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘দেব বারবার বলত, ঘাটালের জলে ভাসত আরামবাগ, খানাকুল থেকে রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ১০ বছর ধরে কেন্দ্রকে চিঠি লিখেছি। একটা টাকাও দেয়নি। শেষ পর্যন্ত রাজ্যের নিজস্ব উদ্যোগেই ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কাজ শুরু করলাম।’ তাঁর দাবি, এই প্রকল্পে দুই মেদিনীপুরের পাশাপাশি হাওড়া ও হুগলির মানুষও উপকৃত হবেন।
বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশী?
মমতা বলেন, ‘এখানে দাঁড়িয়ে একজন বলে গেলেন, আমরা তাঁর চেয়ারটাকে গালি দিচ্ছি না, চেয়ারকে সম্মান করি। বললেন, তারা নাকি ধ্রুপদী ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আমি বলছি, মিথ্যা। আপনারা সব ধ্রুপদী ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষা ছাড়া। আমি পাঁচ বস্তা বই পাঠিয়েছিলাম দিল্লিতে, এভিডেন্স দিয়ে। আমাদের আগে পাওয়া উচিত ছিল। আপনারা করেননি, আমরা বাধ্য করেছি আপনাদের করতে। আমাকে আঘাত করে, আমি প্রত্যাঘাত করি, টর্নেডো হয়ে যাই।’