শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। আচমকা রাজ্যপাল পরিবর্তনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে উঠছে বড় প্রশ্ন—বাংলায় কি রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে? বিধানসভা ভোটের আগে এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যপাল পদে হঠাৎ পরিবর্তন সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর তাৎপর্য অনেক বড়। বিশেষ করে আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে।
তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়টিকে সামনে রেখে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার একটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, ভোটার তালিকার ‘নিবিড় সংশোধন’ বা স্পেশাল রিভিশনের অজুহাতে নির্বাচন কমিশনের কাছে অতিরিক্ত সময় চাওয়া হতে পারে। সেই পরিস্থিতি তৈরি হলে সংবিধানিক জটিলতা দেখা দিতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকেই।
রাজনৈতিক সূত্রের মতে, ইতিমধ্যেই বিজেপি এবং বামপন্থী কিছু দল ‘নো সার, নো ভোট’ স্লোগান তুলেছে। অর্থাৎ ভোটার তালিকার পূর্ণাঙ্গ সংশোধন না হলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না—এই দাবি তুলেছে তারা। এরই মধ্যে বিজেপি পক্ষ থেকে বিপুল সংখ্যক ফর্ম–৭ জমা দেওয়া হয়েছে বলে খবর। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, এই ফর্মের মাধ্যমে কোনও ভোটারের নাম নিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
তৃণমূলের দাবি, যদি সত্যিই কয়েক লক্ষ বা তারও বেশি আপত্তির আবেদন জমা পড়ে, তবে প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী, এই অভিযোগগুলির শুনানি ও যাচাইয়ের জন্য কমিশন মনোনীত আধিকারিকদের কাজ করতে হয়। ফলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
এদিকে সংবিধান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৭ মে। নিয়ম অনুসারে, তার অন্তত ৪৫ দিন আগে নির্বাচন সূচি ঘোষণা করতে হয়। অর্থাৎ সময়ের হিসেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
যদি ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হয়, তবে নির্বাচন কমিশন সময় চাইতে পারে—এমন আশঙ্কাও রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার সম্পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে। ফলে নির্বাচন কবে হবে, সেই সিদ্ধান্তে কমিশনের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রসঙ্গও সামনে আসছে। কারণ, যদি কোনও কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হয় এবং প্রশাসনিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে, তাহলে সাংবিধানিক বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রশ্ন উঠতে পারে—এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
তবে এই নিয়ে মতভেদও রয়েছে। অনেকের মতে, সুপ্রিম কোর্টের নজরদারির মধ্যে এমন পরিস্থিতি সহজে তৈরি হবে না। আবার অন্য অংশের পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন কমিশন যদি প্রশাসনিক কারণে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা জানায়, তবে আদালতও সেই সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতে পারে।
এই প্রসঙ্গেই সম্প্রতি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ভোটের আগে প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক কোনও পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে কোনও ধরনের রাজনৈতিক খেলা হওয়া উচিত নয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, রাজ্যের মানুষ সবকিছুই দেখছেন এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারাই।
অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য এই অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা পরিষ্কার ও স্বচ্ছ রাখা গণতন্ত্রের স্বার্থেই জরুরি। তাই আপত্তি জানানো বা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া ঠিক নয়।

সব মিলিয়ে রাজ্যপাল পরিবর্তন, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন—এই তিনটি বিষয় এখন বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কারণ শেষ পর্যন্ত এই লড়াই শুধুই রাজনৈতিক নয়—এটি বাংলার আগামী নির্বাচনী লড়াইয়ের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে। এখন নজর দিল্লি, নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।