২০১১-র পর অবশেষে শুরু হচ্ছে সেন্সাস, ১ অগাস্ট থেকে সেলফ এনুমারেশন; রাজ্যজুড়ে জোর প্রস্তুতি
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান। অবশেষে বাংলায় শুরু হতে চলেছে জনগণনা বা সেন্সাসের কাজ। আর সেই ঘোষণা করেই রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক উস্কে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নবান্নে শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠক থেকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন—১ অগাস্ট থেকেই শুরু হচ্ছে জনগণনার প্রক্রিয়া, আর এবার পুরো কাজটাই হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে।
শুধু প্রশাসনিক ঘোষণা নয়, এই সেন্সাসকে ঘিরে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এল অনুপ্রবেশ, বদলে যাওয়া জনবিন্যাস এবং আগের সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণও। ফলে জনগণনার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের রাজনৈতিক পারদও চড়তে শুরু করেছে।
শুভেন্দু এ দিন বলেন, “জনগণনা কোনও রাজনৈতিক বিষয় নয়। এটা সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।”
তবে এর পরেই তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য, “বাংলার ডেমোগ্রাফি বদলে গিয়েছে। সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় অনুপ্রবেশের প্রভাব স্পষ্ট।” মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত থাকার কারণে এবং বহু জায়গায় পর্যাপ্ত ফেন্সিং না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
তিনি সরাসরি আগের সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। শুভেন্দুর অভিযোগ, বিএসএফকে জমি না দেওয়ার কারণে সীমান্ত সুরক্ষা দুর্বল হয়েছিল, যার প্রভাব পড়েছে রাজ্যের জনবিন্যাসে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এবারই প্রথম পুরো সেন্সাস হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ১ অগাস্ট থেকে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত চলবে সেলফ এনুমারেশন বা নিজে তথ্য জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া। এরপর ধাপে ধাপে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কাজ চলতে পারে। সময়ের মধ্যে গোটা প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রশাসনকে ইতিমধ্যেই বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নবান্ন সূত্রে খবর, জনগণের সুবিধার জন্য চালু করা হয়েছে বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর ১৮৫৫। এছাড়াও একটি ল্যান্ডলাইন নম্বর এবং সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও নাগরিকরা প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারবেন।
শুভেন্দুর কথায়, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রকৃত নাগরিকদের কোনও সমস্যা হবে না। সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।”
তবে অনুপ্রবেশকারী প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, “অনেক বাংলাদেশি এখন জনগণনার ভয়ে পালাচ্ছে। যাঁরা হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারবেন না।”
যদিও বিরোধীদের একাংশ এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে কটাক্ষ করেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, আগামী নির্বাচনের আগে জনগণনা ইস্যু নতুন করে ভোটের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজ্যের প্রশাসনিক মহলেও এই সেন্সাসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ২০১১ সালের পর আর কোনও পূর্ণাঙ্গ জনগণনা হয়নি বাংলায়। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে একাধিক সরকারি প্রকল্পের তথ্যভাণ্ডার কার্যত পুরনো হয়ে গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন জনগণনার তথ্য ভবিষ্যতের সরকারি নীতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেবে। শহর ও গ্রামের জনসংখ্যার পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের ধরণ, পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা—সব কিছুই এই সেন্সাসে উঠে আসবে।
এদিন শুভেন্দু আগের সরকারের প্রশাসনিক ভূমিকাও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, “এটা কোনও ক্যাবিনেট সিদ্ধান্তের বিষয় ছিল না। প্রশাসনিক স্তরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। কিন্তু আগের মুখ্যসচিব রাজনৈতিক সম্মতির অপেক্ষা করেছিলেন।”
তাঁর দাবি, সেই কারণেই বাংলায় জনগণনার কাজ দীর্ঘদিন আটকে ছিল। ফলে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বাংলা পিছিয়ে পড়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, জনগণনার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে। ডিজিটাল ট্যাব, অনলাইন ডেটা এন্ট্রি এবং রিয়েল টাইম আপডেটের মাধ্যমে এবার তথ্য সংগ্রহ হবে অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে।

রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলা যেমন উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং কোচবিহারে নজর থাকবে বেশি বলেই প্রশাসনিক মহলের ইঙ্গিত।
সব মিলিয়ে, বহু বছরের অপেক্ষার পর বাংলায় শুরু হতে চলা এই ডিজিটাল জনগণনা এখন শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এই সেন্সাসের তথ্য সামনে আসার পর বাংলার বাস্তব ছবিটা ঠিক কতটা বদলে যাবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।