সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘ভয় নয় ভরসা’। এই নামেই বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বিজেপির তরফে বাংলার মানুষের জন্য 15 দফা সংকল্প পত্র ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুক্রবার কলকাতায় এই সংকল্প পত্র প্রকাশ করে অমিত শাহ বলেন, ‘অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বিজেপির। বিজেপির সরকার বানান, অনুপ্রবেশকারীদের ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট করা হবে। অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে খুঁজে তাড়ানো হবে। সরকারি কর্মীদের ডিএ নিশ্চিত করা হবে। ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন চালু হবে। বেকার যুবকদের মাসে ৩০০০ টাকা অনুদান দেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হবে। তৃণমূলের জমানায় দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে। প্রতি মাসে মহিলাদের জন্য ৩০০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। ব্যাঙ্কের মাধ্যমে টাকা মহিলাদের অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে। মহিলাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত, ক্যানসার স্ক্রিনিং করা হবে।’
অমিত শাহ দাবি করেন, তৃণমূলের ১৫ বছরের ‘ভয়ের শাসন’ ও ‘নৈরাজ্য’ থেকে মুক্তি পেতে বাংলার মানুষ এখন পরিবর্তনের জন্য মরিয়া। শাহের কথায়, এই সংকল্প পত্র কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কৃষিজীবী, বেকার যুবক ও মহিলাদের জন্য এক নতুন দিশা। সংকল্প পত্রে সকল রাজনৈতিক হিংসার তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের দিয়ে কমিটি গড়ে দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে বলে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বাংলায় সকল নাগরিকের জন্য এক আইন নিশ্চিত করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অনুপ্রবেশকারীদের জন্য সীমানা সুরক্ষিত করার পাশাপাশি গরু পাচার একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিজেপির এই ‘আশ্বাসপত্রে’ মূলত তিনটি বড় ভোটব্যাঙ্ককে লক্ষ্য করা হয়েছে। মহিলা, সরকারি কর্মচারী এবং বেকার যুবক। তৃণমূলের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের মোকাবিলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার বড় ঘোষণা করেছে। এছাড়াও যুবকদের স্বাবলম্বী করতে ‘যুব সাথী’ প্রকল্পের অধীনে মাসিক ৩,০০০ টাকা ভাতা এবং ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমনে শাহ ঘোষণা করেছেন,সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে সমস্ত বকেয়া ডিএ মেটানো হবে এবং সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা হবে।
উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে এইমস্ ও আইআইটি তৈরির পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করতে ৮ ঘণ্টায় যাতায়াতের জন্য নতুন সড়কপথের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে এই ইস্তেহারে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গে নতুন ক্যান্সার হাসপাতাল ও স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এদিন ইস্তেহার প্রকাশ মঞ্চ থেকে অনুপ্রবেশকারী ও সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেন অমিত শাহ। তিনি জানান, বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনুপ্রবেশকারীদের রুখতে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট’ মডেলে কাজ করা হবে এবং সীমান্তে ৪৫ দিনের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হবে।
এছাড়াও গরু পাচার রোধে কড়া ব্যবস্থা, আয়ুষ্মান ভারত যোজনা কার্যকর করা এবং রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে। সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩% সংরক্ষণ, বেকার যুবকদের জন্য মাসে ৩০০০ টাকা। ৭৫ লাখ দিদিকে লাখপতি বানানোর বড় প্রতিশ্রুতি এদিন দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাজপুরে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট রাজ বন্ধ করা হবে বলেও দাবি করেন অমিত শাহ। সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে ভ্রমণ থেকে সিঙ্গুরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বড় প্রতিশ্রুতি বিজেপি।
বাংলাকে রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলেও উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে আম চাষের জন্য কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা, পাশাপাশি আলু চাষীদের জন্য বিশেষ সুবিধার ঘোষণা করা হয়েছে এদিনের ইস্তেহারে।
প্রতিটি থানায় মহিলা ডেস্ক স্থাপন করা হবে বলে উল্লেখ করে অমিত শাহ বলেন, রাজ্যে ধান উৎপাদন বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বাড়ানো হবে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন। কলকাতাকে বিশ্বের কাছে এক আর্কষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার অঙ্গীকারের পাশাপাশি ভয় মুক্ত বাংলা গড়ার অঙ্গীকার করেন শাহ।
কয়লা, বালি পাচারের অবসান ঘটবে বলে উল্লেখ করে শাহ আশ্বাস দিয়েছেন, কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধির আওতার অধীনে বার্ষিক ৯ হাজার টাকার সাহায্য পাবেন বাংলার কৃষকরা, টিএমসির দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিধানসভা নির্বাচনের মুখে বাংলার নারীশক্তিকে হাতিয়ার করে একগুচ্ছ বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি দিল ভারতীয় জনতা পার্টি। আজ কলকাতায় বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট জানান, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের সমস্ত সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে।
নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মণ্ডলে মহিলা থানা এবং পুলিশ জেলাগুলিতে ২৪ ঘণ্টা সচল মহিলা ডেস্ক স্থাপন করা হবে। এ ছাড়াও রাজ্যজুড়ে মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে ১০০ শতাংশ বিনামূল্যে ভ্রমণের পাশাপাশি অন্তত ৭৫ লক্ষ ‘দিদি’কে স্বনির্ভর ও লাখপতি করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে বিজেপি। সন্দেশখালির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির পর্যবেক্ষণে বিশেষ তদন্ত কমিটি গড়া এবং নারীদের সুরক্ষায় ‘দুর্গা নিরাপত্তা স্কোয়াড’ গঠনের অঙ্গীকার করেছেন শাহ। কর্মসংস্থানের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, সুনির্দিষ্ট ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় মেধার ভিত্তিতে যোগ্যদের স্থায়ী চাকরি নিশ্চিত করা হবে। বেকার যুবকদের জন্য মাসে ৩,০০০ টাকা ভাতার পাশাপাশি চা ও পাট শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং পুরনো চা বাগানগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে দল। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গে ‘এইমস’, ‘আইআইটি’ ও ‘আইআইএম’ নির্মাণের পাশাপাশি সেখানে একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণাও করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গকে ‘ব্লু ইকোনমি’র প্রধান রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত করার পাশাপাশি চারটি নতুন উপনগরী বা স্যাটেলাইট টাউনশিপ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে ইস্তাহারে। প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে শাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, সরকার গঠনের ৬ মাসের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা হবে এবং দুর্নীতিবাজদের কাছ থেকে প্রতিটি পয়সা আদায় করে তাদের জেলে পাঠানো হবে।
হুমায়ুন প্রসঙ্গে
তৃণমূলের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, হুমায়ুন কবীর জনৈক ব্যক্তিকে বলছেন যে, রাজ্যের মুসলিম ভোট বিজেপির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি এক হাজার কোটি টাকা চেয়েছেন। এমনকী, ৩০০ কোটি টাকা নাকি আগামও নিয়ে নিয়েছেন। এই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়। শুক্রবার কলকাতায় শাহকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত কড়া মেজাজে জবাব দেন। শাহের কথায়, ‘বিরোধীদের আসনে কুড়ি বছর বসে থাকতে রাজি আছি, কিন্তু তবুও এই ধরণের মানুষের সঙ্গে হাত মেলাবে না বিজেপি।’ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতা জানেন না। উনি চাইলে এমন একটা নয়, দু-হাজার ভিডিও বানিয়ে দিতে পারেন।’

বিজেপি জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী?
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপি জিদের সরকার গঠন করলেন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন শুক্রবার সেই প্রশ্ন করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। অমিত শাহের পাশে সেই সময় বসে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী, অগ্নিমিত্রা পাল, তাপস রায়, শান্তনু ঠাকুররা। অমিত শাহ বলেন, ‘আমরা তো কোনও বংশ-পরম্পরার পার্টি নই। যে, দিদির পর ভাইপো হবেন। যে কোনও বাঙালি হতে পারেন। বাংলারই বাসিন্দা বিজেপি থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হবেন। এ ব্যাপারে চিন্তা করবেন না। তিনি সক্ষমও হবেন। যোগ্যও হবেন, নেতাও হবেন। সুশাসনও আনবেন।’