শনিবার সকালেই রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের PA-র খোঁজে কালীঘাটে পুলিশ, পৌর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মদন মিত্রের একাধিক ঠিকানায় ED-র তল্লাশি
শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
শনিবার সকালটা শুরু হতেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে যেন ভূমিকম্প! একদিকে কালীঘাটে (Kaliaghat, Kolkata) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) বাড়িতে পুলিশের উপস্থিতি, অন্যদিকে তৃণমূল নেতা মদন মিত্রের (Madan Mitra) একাধিক ঠিকানায় ED-র তল্লাশি—দু’টি ঘটনাই ঘিরে তুমুল জল্পনা ছড়িয়েছে।
সূত্রের খবর, পশ্চিম মেদিনীপুরের (Paschim Medinipur) শালবনি থানার (Salboni Police Station) একটি তদন্তকারী দল শনিবার সকালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে পৌঁছয়। সঙ্গে ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরাও। ঘটনাকে ঘিরে মুহূর্তের মধ্যে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় তীব্র চর্চা।
কিন্তু কেন এই অভিযান?
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সহকারী সুমিত রায় (Sumit Roy)-এর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি আর্থিক প্রতারণা মামলার সূত্র ধরেই এই পদক্ষেপ। অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত চলছে এবং সেই তদন্তের স্বার্থেই সুমিত রায়ের অবস্থান খুঁজছিল পুলিশ।
জানা গিয়েছে, তদন্তকারীরা সুমিত রায়ের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন বিশ্লেষণ করেন। সেই সূত্র ধরেই তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে কালীঘাটের ঠিকানাটি সামনে আসে। এরপরই সেখানে পৌঁছে যায় পুলিশি দল।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই একই তদন্তে এর আগে গ্রেফতার হয়েছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা (Sujay Hazra)। ফলে মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে তদন্তকারীরা কী তথ্য পেয়েছেন বা সুমিত রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন কি না, সে বিষয়ে এখনও সরকারি ভাবে কিছু জানানো হয়নি। তদন্ত চলার কারণেই পুলিশ মুখে কুলুপ এঁটেছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক অভিযোগ, “কোনও বৈধ ওয়ারেন্ট ছাড়াই মধ্যরাতে পুলিশ গেটের তালা ভেঙে আমার বাড়িতে ঢুকে পড়েছে! আমার ব্যক্তিগত ঘরে ঢুকে তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালানো হয়েছে।” (পাল্টা প্রশ্ন উঠছে, তদন্তকারীরা যদি সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনি পদক্ষেপ করে থাকেন, তবে এত আপত্তি কেন?)। নিজের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের খোঁজে এই তল্লাশি নিয়ে কার্যত দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে অভিষেক বলেন, “ওরা কি ভাবছে সুমিতকে আমি আমার নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছি?”
অন্যদিকে, একই দিনে আরেকটি ঘটনাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। পৌর নিয়োগ দুর্নীতি মামলার (Municipal Recruitment Scam) তদন্তে শনিবার সকালে তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্রের একাধিক ঠিকানায় পৌঁছে যায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (Enforcement Directorate) বা ED।
সূত্রের খবর, জোকা (Joka, Kolkata), ভবানীপুর (Bhowanipore, Kolkata) এবং অন্যান্য কয়েকটি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। তদন্তকারীরা পুরনো একটি ফ্ল্যাটেও যান, যেখানে প্রায় এক দশক আগে মদন মিত্র বসবাস করতেন বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারী মহলের দাবি, ব্যবসায়ী অয়ন শীল (Ayan Shil) সংক্রান্ত কিছু তথ্যের সূত্র ধরেই এই তল্লাশি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। যদিও ED এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
শুধু মদন মিত্রই নন, বেলেঘাটা (Beleghata, Kolkata)-র এক ব্যবসায়ীর বাড়িতেও পৌঁছয় ED। ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে অয়ন শীলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদের উৎস সংক্রান্ত একাধিক নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খবর।
সব মিলিয়ে শনিবার সকালেই রাজ্যের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মহলে তৈরি হয়েছে প্রবল আলোড়ন। একদিকে আর্থিক প্রতারণা মামলায় অভিষেকের ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে ঘিরে তদন্ত, অন্যদিকে নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ED-র তৎপরতা—দুটি ঘটনাই নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। ফলে জল্পনা যতই বাড়ুক, নজর এখন তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
প্রশ্ন উঠছে একটাই—শনিবার সকালের এই ধারাবাহিক অভিযানের পর রাজ্যের রাজনীতিতে কি আরও বড় কোনও মোড় অপেক্ষা করছে?