শুক্রবার জেনেভায় চূড়ান্ত সই, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা; তেল বাজারে বড় স্বস্তির ইঙ্গিত, নজরে গোটা বিশ্ব
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত মঞ্চে হঠাৎ বড় মোড়। কয়েক মাসের সংঘাত, হামলা-পাল্টা হামলা এবং তেল পরিবহণ ঘিরে উদ্বেগের পর অবশেষে সমঝোতার পথে আমেরিকা ও ইরান। আর সেই খবর সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কূটনৈতিক মহল— সর্বত্র শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
সবচেয়ে বড় ঘোষণা এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump)। সমাজমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে এবং হরমুজ় প্রণালী (Strait of Hormuz) পুনরায় খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ওই জলপথে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি।
ট্রাম্পের বার্তা ছিল স্পষ্ট এবং যথেষ্ট নাটকীয়। তাঁর কথায়, “চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সকলকে অভিনন্দন। এবার বিশ্বের জাহাজগুলো তাদের ইঞ্জিন চালু করুক, তেল পরিবহণ আবার স্বাভাবিক হোক।”
যদিও বাস্তবে এখনও চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর হয়নি। সূত্রের দাবি, আগামী ১৯ জুন সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনেভায় (Geneva, Switzerland) দুই পক্ষের প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিপত্রে সই করবেন। তারপরই কার্যকর হবে নতুন ব্যবস্থা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি?
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। পশ্চিম এশিয়ার (Middle East) এই সরু জলপথ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক কৌশলগত রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে হরমুজ় খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তির বার্তা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, তাঁর প্রশাসনের এই উদ্যোগ পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। তিনি বলেন, “আমার আগে অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সফল হননি। এই চুক্তি অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পথে বড় পদক্ষেপ হতে পারে।”
এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ কয়েক মাস আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইজ়রায়েলি যৌথ অভিযানের পর ইরান এবং আমেরিকার সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। এরপর একাধিকবার পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থকে লক্ষ্য করে উত্তেজনা তৈরি হয়। সেই সময় হরমুজ় প্রণালী ঘিরেও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
সূত্রের মতে, ওই সময়ে জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। এখন চুক্তি কার্যকর হলে ধাপে ধাপে সেই বাধাগুলি সরানোর কাজ শুরু হতে পারে।
চুক্তি নিয়ে প্রথমে পাকিস্তান (Pakistan) আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য প্রকাশ করে। পরে মার্কিন প্রশাসন এবং ইরানের তরফ থেকেও সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। যদিও তেহরান প্রথমদিকে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল এবং রবিবার চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছিল।
তবে পরবর্তীতে দুই পক্ষই আলোচনার অগ্রগতির কথা স্বীকার করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনও পূর্ণাঙ্গ বা চূড়ান্ত চুক্তি নয়। আপাতত হরমুজ় প্রণালী খুলে দেওয়া এবং বাণিজ্যিক পরিবহণ স্বাভাবিক করাই প্রধান লক্ষ্য। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি (Iran Nuclear Program) এবং অন্যান্য সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে আরও জটিল আলোচনা হতে পারে।

ফলে আপাতত বিশ্ববাজারে স্বস্তির হাওয়া বইলেও কূটনৈতিক লড়াই যে পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, তা স্পষ্ট। বরং শুক্রবারের জেনেভা বৈঠকই ঠিক করে দিতে পারে আগামী দিনে আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক কোন পথে এগোবে।
এখন প্রশ্ন একটাই— হরমুজ়ের দরজা খুললে কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমবে, নাকি এটি আরও বড় কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা মাত্র?