বালিগঞ্জ থেকে বারুইপুর, বনগাঁ থেকে ডানকুনি—উচ্ছেদ অভিযানের মাঝেই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আদালতের, স্বস্তিতে বহু হকার পরিবার
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
হকার উচ্ছেদ নিয়ে রাজ্যজুড়ে যখন তীব্র উদ্বেগ, তখনই বড় বার্তা দিল কলকাতা হাইকোর্ট। রেলের জারি করা উচ্ছেদ নোটিস কি সব ক্ষেত্রেই কার্যকর করা যাবে? জমির মালিকানা নিয়েই যদি প্রশ্ন থাকে, তাহলে কী হবে? বুধবার এই সব প্রশ্নকে সামনে রেখেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল আদালত।
সব মামলার জন্য এক নির্দেশ নয়—এই নীতিতেই এগোল কলকাতা হাইকোর্ট। কারণ কোথাও বাজার, কোথাও দোকান, কোথাও আবার বহু বছরের বসতি। তাই এক ছাঁচে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলেই স্পষ্ট জানিয়ে দিল আদালত।
বুধবার (Calcutta High Court) কলকাতা হাইকোর্টে রেলের উচ্ছেদ নোটিসকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া মোট ২৫টি মামলার শুনানি হয়। বিচারপতি (Hirannmay Bhattacharyya) হিরন্ময় ভট্টাচার্য প্রতিটি মামলার পরিস্থিতি আলাদা করে খতিয়ে দেখেন। আর সেখানেই উঠে আসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, কয়েকটি ক্ষেত্রে আদালতের সামনে প্রশ্ন ওঠে—যে জমির উপর উচ্ছেদ নোটিস জারি করা হয়েছে, তা আদৌ রেলের মালিকানাধীন কি না।
আদালত জানিয়ে দেয়, শুধু মানচিত্র দেখিয়ে দায় সারা যাবে না। বাস্তবে জমির মালিকানা কার, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, কাগজে-কলমে যা দেখা যাচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতি তার থেকে ভিন্নও হতে পারে। ফলে আগে রেলকে নিজেদের জমি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
এই পর্যবেক্ষণের জেরেই বড় স্বস্তি পেয়েছেন বহু হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, (Ballygunge) বালিগঞ্জ, (Baruipur) বারুইপুর, (Bamangachhi) বামনগাছি, (Dankuni) ডানকুনি, (Guma) গুমা, (Bongaon) বনগাঁ, (Durganagar) দুর্গানগর, (Mathurapur) মথুরাপুর এবং (Jadavpur) যাদবপুর-সহ একাধিক এলাকায় রেলের আগের উচ্ছেদ নোটিস আপাতত জুলাই মাস পর্যন্ত কার্যকর করা যাবে না।
শুনানির সময় আদালত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে নজর দেয়। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, যেসব জায়গায় নোটিস দেওয়া হয়েছে, সব জায়গার পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও বহু বছরের বাজার গড়ে উঠেছে, কোথাও ছোট দোকান, আবার কোথাও মানুষের বসবাসও রয়েছে।
ফলে প্রতিটি মামলাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েই শুনানি চালানো হবে বলে জানিয়েছে আদালত।
এর মধ্যেই সামনে আসে পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ। দুটি মামলায় আদালত জানতে চায়, যাঁদের একসময় বসার অনুমতি দিয়েছিল রেল নিজেই, তাঁদের উচ্ছেদ করা হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কী ভাবা হয়েছে?
আদালতের বক্তব্য, বহু ক্ষেত্রে অতীতে রেল কর্তৃপক্ষই স্টল বা ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দিয়েছিল। পরবর্তীতে সেই অনুমতির নবীকরণ না হলেও, উচ্ছেদের সময় মানবিক দিকটি বিবেচনা করা জরুরি।
শুনানিতে হকারদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী (Bikash Ranjan Bhattacharya) বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য তীব্র সওয়াল করেন। তাঁর দাবি, বর্তমান উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। জীবিকা এবং কর্মসংস্থানের অধিকারের বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না।
তবে আদালতও পাল্টা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। বিচারপতি জানতে চান, যদি রেলের নিজস্ব জমি বা প্ল্যাটফর্ম অবৈধভাবে দখল করে ব্যবসা চালানো হয়, তাহলে কি সেই দখল সরানো যাবে না?
এই প্রশ্নে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, একদিকে যেমন জীবিকার অধিকার রয়েছে, অন্যদিকে সরকারি সম্পত্তি রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে (Baruipur) বারুইপুরের একটি মামলায় আদালতের সামনে নথি পেশ করে জানানো হয়, অন্তত দু’জন হকারের বৈধ লাইসেন্স ছিল। সেই তথ্য সামনে আসতেই বিচারপতি রেলকে নির্দেশ দেন, লাইসেন্সধারী ওই হকারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে আদালতকে জানাতে হবে।

ফলে এই মামলার শুনানি এখন শুধু উচ্ছেদ বনাম দখলদারির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন উঠেছে পুনর্বাসন, জীবিকার অধিকার এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়েও।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর নজর এখন এই মামলার দিকে। কারণ আদালতের চূড়ান্ত অবস্থানই নির্ধারণ করতে পারে—উচ্ছেদই শেষ কথা, নাকি পুনর্বাসনের পথ খুলবে প্রশাসন? আগামী শুনানিতে সেই উত্তর খুঁজছে বাংলা।