নেইমারের চোখে জল, ভিনিসিয়াসের জোড়া আঘাত! স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে ব্রাজিল, বিশ্বকাপ জয়ের বার্তা সেলেসাওদের
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিল মানেই আলাদা আবেগ। আর সেই আবেগই যেন নতুন করে বিস্ফোরিত হল মায়ামির (Miami World Cup) হার্ড রক স্টেডিয়ামে। স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করে শুধু নকআউটেই উঠল না, গোটা ফুটবল বিশ্বকে শক্তিশালী বার্তাও দিয়ে দিল ব্রাজিল (Brazil Football Team)।
তবে ম্যাচের স্কোরলাইন যতটা আলোচনায়, তার থেকেও বেশি আলোচনায় একজন মানুষ—নেইমার জুনিয়র (Neymar Jr)।
দীর্ঘ অপেক্ষা, একের পর এক চোট, জাতীয় দলের বাইরে কাটানো কঠিন সময়—সবকিছুর পর অবশেষে আবার ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে ফিরলেন তারকা ফুটবলার। আর সেই প্রত্যাবর্তনের মুহূর্ত যেন রূপ নিল আবেগের এক সিনেমায়।
ম্যাচ শুরুর আগেই গ্যালারিতে ছিল উৎসবের আবহ। হাজার হাজার সমর্থকের কণ্ঠে একটাই নাম—নেইমার। কিন্তু মাঠে নামার আগেই ব্রাজিল নিজেদের কাজ প্রায় সেরে ফেলেছিল।
খেলার মাত্র সপ্তম মিনিটেই স্কটিশ রক্ষণে প্রথম ধাক্কা দেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র (Vinicius Junior)। দুর্দান্ত আক্রমণ থেকে গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন তিনি।
সেই গোলের ধাক্কা সামলানোর আগেই আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে সেলেসাওদের আক্রমণভাগ। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে আবারও গোল করে নিজের দ্বিতীয় গোলটি তুলে নেন ভিনি। স্কটল্যান্ড তখন কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েছে।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাথিউস কুনিয়া (Matheus Cunha) স্কোরলাইনে নিজের নাম যোগ করতেই ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত হয়ে যায়।
স্কটল্যান্ড (Scotland Football Team) কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করলেও ব্রাজিলের সংগঠিত রক্ষণভাগ এবং মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণের সামনে তারা কার্যত অসহায় দেখিয়েছে।
তবে ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায় ৭৬ মিনিটে।
সাইডলাইনে ওয়ার্ম-আপ করছিলেন নেইমার। তাঁকে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিতে দেখেই গ্যালারি গর্জে ওঠে। হাজার হাজার সমর্থক দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে।
অবশেষে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। সময়টা খুব বেশি ছিল না, কিন্তু মুহূর্তটা ছিল ঐতিহাসিক।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর জাতীয় দলের হয়ে আর খেলতে পারেননি নেইমার। গুরুতর চোট তাঁকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে রেখেছিল। চলতি বিশ্বকাপেও প্রথম দুটি ম্যাচে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল।
তাই এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন ফুটবলারের মাঠে ফেরা নয়, বরং লড়াই করে ফিরে আসার এক প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মাঠের মধ্যেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন নেইমার। ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাঁর চোখের জল।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সেই দৃশ্য যেন অনেক কিছু বলে দিয়েছে। কারণ এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে রয়েছে প্রায় তিন বছরের অপেক্ষা, যন্ত্রণা এবং অনিশ্চয়তা।
অন্যদিকে ব্রাজিল শিবিরে এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র।
রিয়াল মাদ্রিদ (Real Madrid) তারকা চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে জোড়া গোলের পর তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার।
এর ফলে গোলদাতার তালিকায় তিনি উঠে এসেছেন আর্লিং হালান্ড (Erling Haaland) এবং কিলিয়ান এমবাপে (Kylian Mbappe)-র সমতুল্য স্থানে।
তাঁদের সামনে রয়েছেন কেবল লিওনেল মেসি (Lionel Messi), যার ঝুলিতে রয়েছে পাঁচ গোল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেইমারের অভিজ্ঞতা এবং ভিনিসিয়াসের বিস্ফোরক ফর্মের সংমিশ্রণ ব্রাজিলকে নকআউট পর্বে আরও ভয়ংকর করে তুলতে পারে।
এই জয়ের ফলে আরেকটি নজিরও গড়েছে ব্রাজিল।
টানা ১৫তম বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করল তারা। বিশ্ব ফুটবলে ধারাবাহিকতার এমন রেকর্ড খুব কম দেশেরই রয়েছে।

অন্যদিকে গ্রুপ থেকে রানার্সআপ হিসেবে শেষ ষোলোয় উঠেছে মরক্কো (Morocco Football Team)। হাইতির বিরুদ্ধে ৪-২ ব্যবধানে জিতে তারা নিজেদের অভিযান জারি রেখেছে।

স্কটল্যান্ডের জন্য অবশ্য গল্পটা ভিন্ন।
১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলতে নেমেছিল তারা। সমর্থকদের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। বোস্টন (Boston) থেকে মায়ামি—যেখানেই গিয়েছে, স্কটিশ সমর্থকেরা উৎসবের পরিবেশ তৈরি করেছেন।

কিন্তু মাঠের ফলাফল বদলাতে পারেনি সেই আবেগ।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত একবারও গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি স্কটল্যান্ড। এবারও সেই আক্ষেপ সঙ্গী করেই বিদায় নিতে হল তাদের।
এখন অবশ্য সব নজর ব্রাজিলের দিকে। কারণ গ্রুপ পর্ব শেষ, শুরু আসল যুদ্ধ। নকআউটে একটি ভুল মানেই স্বপ্নভঙ্গ।
তবে নেইমার ফিরেছেন, ভিনিসিয়াস আগুনে ছন্দে আছেন, আর ব্রাজিল আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছে। ফুটবল বিশ্ব তাই একটাই প্রশ্ন করছে—এই সাম্বা বাহিনী কি সত্যিই আবার বিশ্বকাপ জয়ের পথে এগোচ্ছে?