সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
বাংলা ভাষায় কথা বলা কি অপরাধ? এমন প্রশ্ন ফের মাথা চাড়া দিল উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় ঘটে যাওয়া এক ঘটনার পর। কলকাতার নিউটাউনের এক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী অভিযোগ করেছেন, অনলাইনে হোটেল বুকিং থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ও তাঁর ছেলেকে কেবলমাত্র বাংলায় কথা বলার কারণে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ওই আইটি কর্মীর ছেলে একজন জাতীয় স্তরের স্কেটার। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাবা-ছেলে নয়ডায় পৌঁছন। আগেই একটি হোটেলে দুই রাত থাকার জন্য ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বুকিং করেছিলেন তিনি। কিন্তু হোটেলের রিসেপশনিস্ট জানিয়ে দেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাভাষী, বাংলাদেশ, পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীর থেকে আসা অতিথিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ পেয়েছেন তারা।
প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো কোনও ভুল বোঝাবুঝি। কিন্তু নিজের পরিচয় দিয়ে জানানোর পরও পরিস্থিতি বদলায়নি। রিসেপশনিস্ট সরাসরি বলেন, “বাংলাদেশি আর পশ্চিমবঙ্গের যারা বাংলা ভাষায় কথা বলে, তারা সবাই এক ধরনের।” ফলে বুকিং থাকা সত্ত্বেও তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
বাধ্য হয়ে ওই আইটি কর্মী ওয়েবসাইট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওয়েবসাইটের তরফে জানানো হয়, ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত নয়ডার সেক্টর ৪৯ এলাকায় অন্য একটি হোটেল বুক করতে হয়, যা প্রতিযোগিতার ভেন্যু থেকে অনেক দূরে ছিল।
ঘটনার পর ওয়েবসাইট কর্তৃপক্ষ ক্ষমা প্রার্থনা করে জানায়, সংশ্লিষ্ট হোটেল ‘মীরা ইটারনিটি’কে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে, হোটেলগুলিতে অতিথিদের প্রবেশে ভাষা বা রাজ্যের ভিত্তিতে কোনও বৈষম্য করার নির্দেশিকা কখনও জারি করা হয়নি এবং এই ধরনের নীতি তারা সমর্থন করে না।
এমন ঘটনা শুধু একক নয়। গত কয়েক মাসে বাংলায় কথা বলার কারণে বিভিন্ন ‘ডাবল ইঞ্জিন’ শাসিত রাজ্যে বাঙালিদের উপর হয়রানি ও বৈষম্যের অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে। অতীতে মূলত পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গেই এই ধরনের ঘটনা ঘটত। কিন্তু এবার দেশের অন্যতম বড় প্রযুক্তি শিল্পে কর্মরত একজন আইটি পেশাদারের সঙ্গেও একই অভিজ্ঞতা ঘটায় উদ্বেগ বেড়েছে।
বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও নয়ডায় কর্মরত বহু বাঙালি প্রযুক্তি কর্মী মনে করছেন, এভাবে চলতে থাকলে রাজ্যের বাইরে কর্মজীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠনও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে এবং ভাষার ভিত্তিতে বৈষম্য রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছে।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বৈষম্য আজও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্যমান। সংবিধানের ১৯ নং অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিককে মতপ্রকাশ ও ভাষা ব্যবহারের স্বাধীনতা দেওয়া হলেও, বাস্তবে তা কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।