সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
দীঘার জগন্নাথধাম, নিউটাউনের দুর্গাঙ্গন কিংবা শিলিগুড়ির মহাকাল মন্দির—রাজ্যের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একের পর এক ‘তীর্থ’ গড়ে তুলে চমক দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে চলেছে একেবারে আলাদা এক তীর্থ—বই-তীর্থ। কলকাতার সল্টলেক বইমেলা প্রাঙ্গনেই গড়ে উঠবে এই অভিনব স্থাপনা, যার ঘোষণা এল ৪৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে।
বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের তরফে এই বই-তীর্থ নির্মাণের জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। আগামী বছর কলকাতা বইমেলার ৫০ বছর পূর্তি—সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতেই এই উদ্যোগ।
✨ ভাবনার শুরু যেভাবে
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন,
“দিদি, আপনি আমাদের রাজ্যে জগন্নাথ ধাম, মহাকাল তীর্থের মতো ভাবনা দিয়েছেন। বইয়ের জন্য কি এমন কিছু করা যায় না?”
সেই প্রশ্নের জবাব যেন মুহূর্তেই দিয়ে দেন মমতা। মঞ্চ থেকেই তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব শান্তনু বসুকে ডেকে স্পষ্ট নির্দেশ—
“ওরা একটা বই-তীর্থ করতে চাইছে। করে দাও। পুরোটা বই দিয়েই হবে।”
মমতা জানান, এই ভাবনাটা তাঁর মাথায় অনেকদিন ধরেই ছিল। এমনকি তিনি নিজে একটি রাফ স্কেচও করেছিলেন, যদিও সময়ের অভাবে তা সম্পূর্ণ করা হয়নি। এবার সেই ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময়।

📖 বই দিয়েই গড়ে উঠবে বই-তীর্থ
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, বই-তীর্থ হবে একেবারেই বই-কেন্দ্রিক। নির্মাণ, ভাবনা, নকশা—সবটাই বইকে ঘিরে। গিল্ডকে অফিসিয়াল লেটার দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, সরকারিভাবে অডিটের প্রয়োজন আছে, তবে ভাবনার স্বাধীনতা পুরোপুরি গিল্ডের হাতেই থাকবে।
লক্ষ্য একটাই—৫০ বছরে পা দেওয়া কলকাতা বইমেলায় যেন শুধু বইয়ের প্রাঙ্গন নয়, একটি স্থায়ী বই-তীর্থও উপহার দেওয়া যায় পাঠকদের।
🔨 ৪৯ বার হাতুড়ি, ঐতিহ্যের ছোঁয়া
কলকাতা বইমেলার চিরাচরিত রীতি মেনেই এদিন মুখ্যমন্ত্রী প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের পাশাপাশি ৪৯ বার হাতুড়ি পিটিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
🌍 থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা
এবছর কলকাতা বইমেলার থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা। মোট ১১০০টি স্টল থাকছে মেলায়। আর্জেন্টিনা, জার্মানি, চীন-সহ বিশ্বের ২১টি দেশ এবছর অংশ নিয়েছে।
ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় জানান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আর্জেন্টিনার লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মৃতিই এবছরের থিমকে আরও গভীরতা দেবে। কলকাতা ও আর্জেন্টিনার এই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন বইমেলাকে এনে দিচ্ছে এক অনন্য আন্তর্জাতিক মাত্রা।
🏛️ বিশেষ হল ও স্মরণ
এবছর বইমেলায় মহাশ্বেতা দেবী, উত্তম কুমার, সলিল চৌধুরী ও ভূপেন হাজারিকার নামে বিশেষ হল ও তোরণ উৎসর্গ করা হয়েছে।
গিল্ডের উদ্যোক্তারা বারবার তুলে ধরেন—মুখ্যমন্ত্রীর সৌজন্যেই আজ বইমেলার নিজস্ব ঠিকানা রয়েছে। নাহলে প্রকাশক আর পাঠকদের আজও ঘুরে বেড়াতে হত ভ্রাম্যমাণের মতো।
🏅 লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট সম্মান
আজীবন সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তীর হাতে মুখ্যমন্ত্রী তুলে দেন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিকরা, মন্ত্রীসভা সদস্যরা, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও শিল্পীরা। থিম কান্ট্রির প্রতিনিধি হিসেবে মঞ্চে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মারিয়ানো কৌসিনো।
📚 বই নিয়ে মমতার মনকথা
বক্তব্যের শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“বইয়ের কোনও ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। বই সবার প্রাণ, সবার মান, সবার সম্মান। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, এআই এসেছে—তবুও বইপ্রেমীদের সংখ্যা কমেনি।”
নিজের লেখালেখির প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, সময় পেলেই তিনি হাতে বই লেখেন। কম্পিউটারে টাইপ করলে মন ভরে না—এই অভ্যাস আজও বদলায়নি।
👉 সল্টলেকের বুকে বই-তীর্থ—শুধু একটি স্থাপনা নয়, এ যেন আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। কলকাতা বইমেলা ৫০ বছরে পা দেওয়ার আগে এমন ঘোষণায় বইপ্রেমীদের উচ্ছ্বাস যে আরও বাড়বে, তা বলাই যায়।