সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
“জনপ্রতিনিধিরা ফের ভোটে জিতে দেখান, তবেই আমরা পরীক্ষা দেব।” এমন অভিনব হুঁশিয়ারি দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বাতিলের দাবিতে চরম আন্দোলনে নামলেন ২০১৬ সালের এসএসসি প্যানেলের চাকরিহারারা। আন্দোলন চলছিলই। অবশেষে ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙল চাকরিহারাদের। ব্যারিকেড ভেঙে এবার সটান বিকাশ ভবনের ভিতরে ঢুকে পড়লেন তাঁরা।
যোগ্য-অযোগ্য বাছাই করা যায়নি। এসএসসির ২০১৬ সালে পুরো প্যানেলই বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। রাতারাতি চাকরি হারিয়েছেন ২৬ হাজার শিক্ষকরা। সঙ্গে শিক্ষাকর্মীরাও। চাকরি ফেরতের দাবিতে ৯ দিন ধরে বিকাশ ভবনের সামনে ধর্না দিচ্ছেন যোগ্য শিক্ষকরা। আজ, বৃহস্পতিবার বিকাশ ভবন অভিযানের ডাক দেন তাঁরা।
সেখান থেকেই চাকরিহারারা দাবি তুললেন, “দ্বিতীয়বার আমরা পরীক্ষা দেব না। আমাদের পরীক্ষা দিতে হলে মুখ্যমন্ত্রী, সাংসদ সবাইকে পরীক্ষা দিতে হবে।” এমনকী তাঁরা এও বলেন, “নেতা-মন্ত্রী ধরে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাইনি, কেন বার বার পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে?” উঠল উই ওয়ান্ট জাস্টিস স্লোগান।
তাদের অভিযোগ, “আলোচনা না করেই ভিতরে ভিতরে পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু। বিকাশ ভবনের সামনে অবস্থান করছি, আগেও প্রতিশ্রুতিভঙ্গের কাহিনি শুনেছি। না জানিয়ে রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হয়েছে। দীর্ঘ ৭ বছর ধরে চাকরি করছি, আমাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই। চাকরি যাওয়ার জন্য দায়ী স্কুল সার্ভিস কমিশন ও রাজ্য সরকার। আগে সবাই ফের নির্বাচনে দাঁড়াক, তারপর আমরা পরীক্ষার কথা ভাবব। যাদের কারণে চাকরি গিয়েছে, রিভিউ পিটিশনে আমাদের চাকরি ফেরত নিয়ে আসতে হবে। স্কুলে সসম্মানে ফেরাতে হবে। বিকাশ ভবনের গেট ভেঙে শিক্ষক-শিক্ষিকারা ঢুকে গেছে। যাদের জীবনের গেট ভেঙে গেছে, তাদের কতদিন আটকে রাখা যাবে।”
পাশাপাশি আন্দোলনরত চাকরিহারাদের দাবি, “ওএমআর শিটের মাধ্যমে যোগ্য-অযোগ্যদের তালিকা নিয়ে মামলা রিভিউ করুক রাজ্য। আমাদের ন্যায় বিচার হোক, চোরেরা শাস্তি পাক। অন্যের পাপের দায় আমরা নেব না।” যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের প্রশ্ন, “অযোগ্যদের বাঁচাতে রাজ্যের এত দরদ কেন? কেন যোগ্য ও অযোগ্যদের তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না? এভাবে যোগ্যদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ফেলে রাজ্য কাদেরকে বাঁচাতে চাইছে? রিভিউ পিটিশনের আগে আমাদের ড্রাফ্ট দেখানো হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রাজ্য। বাস্তবে অবশ্য তা হয়নি। আমাদের অন্ধকারে রেখে চুপি চুপি রাজ্য সুপ্রিমকোর্টে রিভিউ পিটিশন দাখিল করেছিল।”
এই মামলার আইনি প্রেক্ষাপটও জটিল। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হননি এমন শিক্ষকদের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাকরি বহাল থাকবে। তবে তার আগে মে মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আসার পর থেকেই চাকরিহারারা নতুন করে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের মূল দাবি ছিল, একবার কষ্ট করে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়ার পর আর নতুন করে পরীক্ষা দেবেন না, বরং তাদের আগের পদে পুনর্বহাল করা হোক।
প্রসঙ্গত, গতকাল মঙ্গলবার এসএসসির গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি-র চাকরিহারাদের অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, “পশ্চিমবঙ্গ শ্রম দফতরের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ জীবিকা এবং সামাজিক নিরাপত্তা অন্তর্বর্তী প্রকল্পে গ্রুপ সি ও গ্রু ডি কর্মচারীদের ১ এপ্রিল থেকে মাসে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত না হচ্ছে, গ্রুপ সি ২৫ হাজার, গ্রুপ ডি ২০ হাজার করে অনুদান দেওয়া হবে।”

বৃহস্পতিবার বিশাল জমায়েত করে বিকাশভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা, তখন তাঁদের বাধা দেয় পুলিস। এরপর দু’পক্ষের মধ্যে শুরু হয় বচসা, ধস্তাধস্তি। শেষে ব্যারিকেড ভেঙে বিকাশ ভবনের ভিতরে ঢুকেও পড়েন তাঁরা। চাকরিহারাদের আন্দোলনের মাঝেই বিকাশভবনে পৌঁছন বিধাননগর পুরসভার চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্ত। বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনিও। সব্যসাচীর গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েন চাকরিহারা চাকরিহারারা। এমনকী, জুতোও দেখানো হয়। এই পরিস্থিতিতে মেজাজ হারান তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্ত। বিক্ষোভকারী চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিকে তেড়ে যান তিনি। তাঁর নিরাপত্তা রক্ষী ও পুলিশ কোনওমতে তাঁকে ভিড় ঠেলে বের করে আনার চেষ্টা করলেও উত্তেজনা কমেনি। অভিযোগ উঠেছে, তৃণমূল নেতার অনুগামীরা হেলমেট দিয়ে বিক্ষোভকারী শিক্ষকদের মারধর করেছেন।
ঘটনা প্রসঙ্গে সব্যসাচী দত্ত নিজেও বিস্ফোরক মন্তব্য করে বলেন, “ভাই, আমার গাড়ি আমার ওয়ার্ডে আটকালে তো আর আদর করবে না।”

তাঁর এই মন্তব্য আগুনে ঘি ঢালে। চাকরিহারারা রীতিমতো ঘিরে ধরেন সব্যসাচীকে। তাঁকে ধরে রীতিমতো টানা হিঁচড়া চলতে থাকে। নিরাপত্তা রক্ষীরাও তাঁদের সামাল দিতে পারছিলেন না প্রাথমিকভাবে। তাঁকে কোনওক্রমে বার করে আনার চেষ্টা চলে। ভিড়ের মাঝ থেকে টেনে বার করে আনেন। চাকরিহারাদের ভিতর থেকে স্লোগান ওঠে ‘চাকরি চোর’। সব্যসাচীকে কোনওক্রমে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছন নিরাপত্তারক্ষীরা। সেসময়ে রীতিমতো গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েন চাকরিহারারা। সব্যসাচী বলেন, “আমি আমার নিজের কাজে এসেছিলাম। ওরা ওদের আবেগে করছে। মুখ্যমন্ত্রী রিভিউ পিটিশন করেছেন। ওদের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। ওরা জানেও না কাকে বিক্ষোভ দেখাবে? চোর স্লোগান কাকে দিচ্ছে ওরাই জানে, ওরা কাকে দিয়েছে, ওরাই জানে…”
আন্দোলনকারীরা প্রশ্ন তোলেন, যাদের অবৈধভাবে চাকরি দেওয়া হয়েছে, সব্যসাচী দত্ত নিজেও কি সেই পথেই চাকরি দিয়েছেন? এই ঘটনার পর তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা এবং মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করেন। চাকরিহারাদের হুঁশিয়ারি, যতদিন না তাদের হকের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এই আন্দোলন চলবে।