সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘জাতীয় নির্বাচন কমিশন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে খুশি করছে। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কারণেই বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) এবং সাধারণ নাগরিকদের একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এসআইআরের কারণেই ৩৪ জন মারা গিয়েছেন এবং এই মৃত্যুর জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায় নিতে হবে।’ শনিবার জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে রীতিমতো ডেপুটেশন দিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ত্রুটি তুলে ধরার পাশাপাশি এমন বিষ্ফোরক অভিযোগ তুলল তৃণমূলের বিশেষ প্রতিনিধি দল। নির্বাচন কমিশনে যাওয়া তৃণমূলের প্রতিনিধি দলে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক।
সিইও-র কার্যালয়ে গিয়ে এই উদ্বেগগুলি তুলে ধরে তাঁরা একটি স্মারকলিপি জমা দেন। মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে কাজ করতে সাধারণত দুই বছর সময় লাগে, সেখানে তা এখন দুই মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কমিশন একটি রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিটি বুথে ১৫০ থেকে ২০০ ভোটারের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রচুর ত্রুটি রয়েছে। এই ত্রুটিগুলির কারণে জীবনহানি ঘটছে।’
পাশাপাশি তৃণমূলের পক্ষ থেকে আজ সিইও দপ্তরের বাইরে দাঁড়িয়ে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বলা হয়, ‘এই তড়িঘড়ি ও বেপরোয়া বাস্তবায়নের জন্য আমরা জোরালোভাবে বিরোধিতা করছি বাংলায় এসআইআর–এর। এটি কোনও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয় — এটি গণতন্ত্রের উপর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ। বিজেপি-নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন শুধুমাত্র দিল্লির ইশারায় এসআইআর-কে দ্রুত এগিয়ে দিচ্ছে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, আইন কিংবা জীবনের কোনও পরোয়া না করে। নোটবন্দি থেকে ভোটবন্দি — এই বিজেপি সরকার দেশকে এক এক করে নিয়ে যাচ্ছে ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান এক্সক্লুশন’-এর দিকে। আগে এই একই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে দুই বছর সময় লেগেছিল, অথচ এইবার বিজেপি চায় দুই মাসের মধ্যেই তা শেষ করতে। এই অসম্ভব সময়সীমার ফলে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ এনুমারেশন ফর্ম নিয়ে বুথে বুথে দৌড়াচ্ছেন, কিন্তু কেউই সঠিকভাবে তাদের দিকনির্দেশ দিতে পারছে না। বিএলও-রাও সঠিক প্রশিক্ষণ পাননি। তাহলে তাঁরা নাগরিকদের কীভাবে স্পষ্ট তথ্য দেবেন? একটি পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশনের অদক্ষতার বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যেটি এখন বিজেপির রাজনৈতিক শাখার মতো আচরণ করছে।
আরও একটি গুরুতর লঙ্ঘন হল ২০০২ সালের পুরনো ভোটার তালিকাকে এসআইআর–এর বেস হিসেবে ব্যবহার করা, যদিও ২০০৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে ডিলিমিটেশন হয়েছিল। নিয়ম অনুসারে ডিলিমিটেশন হওয়ার পর পুরনো ভোটার তালিকা বাতিল করে সংশোধিত তালিকাকে বেস ধরা বাধ্যতামূলক। নির্বাচন কমিশন এই নিয়ম অমান্য করায় এসআইআর আইনগতভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রশাসনিকভাবেও অবৈজ্ঞানিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ভুল নয়, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভোটার তালিকাকে বিকৃত করার চেষ্টা। নিজেদের মৌলিক ভোটাধিকার সুরক্ষিত করতে গিয়ে মানুষ মারা যাচ্ছেন। এসআইআর–এর কারণে তৈরি বিশৃঙ্খলায় ইতিমধ্যেই ৩০ জনেরও বেশি সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অথচ প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কিংবা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক — কারও কাছ থেকেই একটি শব্দও সমবেদনা বা দায় স্বীকারের বার্তা আসেনি। তাদের নীরবতা আসলে অজ্ঞতা নয় — অপরাধবোধ। বিএলও-রা অসহনীয় চাপের নিচে ভেঙে পড়ছেন। তাঁদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ভয় দেখানো হচ্ছে, বিপজ্জনক ও প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাঁরা সরকারি কর্মচারী, দলদাস নয়। নির্বাচন কমিশন তাঁদেরকে বিজেপির ভোটার তালিকা বদলের পরিকল্পনার ব্যবহারযোগ্য যন্ত্র হিসেবে দেখছে। মনোজ আগরওয়াল ও জ্ঞানেশ কুমারকে জবাব দিতে হবে, কেন তাঁরা জানতেই জেনেও এই বিপজ্জনক ও প্রতারণামূলক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন? তাঁদের পক্ষপাত স্পষ্ট, আর উদ্দেশ্য রাজনৈতিক। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার বদলে তাঁরা বিজেপির এজেন্টের মতো আচরণ করছেন, যাতে প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া যায় — বিশেষ করে সেই সব মানুষদের, যারা দিল্লির শাসক দলের বাংলা-বিরোধী এজেন্ডার সামনে মাথা নত করতে রাজি নন। পুরো প্রক্রিয়ার সময়সূচিই এর আসল উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেয়। বিজেপির নিজেদের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী, যদি এখনই নির্বাচন হয়, দলটি বাংলায় মাত্র ৪৬ থেকে ৪৯টি আসনে নেমে আসবে। বিজেপি জানে মানুষের বিশ্বাস তারা হারিয়েছে এবং গণতান্ত্রিকভাবে জিততে পারবে না। তাই তারা মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে ভয় পেয়ে এখন এসআইআর-কে শেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে — ভোটার তালিকা বিকৃত করে এমন একটি ফল তৈরি করতে, যা তারা ভোটে জিতে সৎ ভাবে করতে পারবে না।’
