নবনির্বাচিত বিধায়কদের প্রশিক্ষণ শিবিরে শুভেন্দু অধিকারী, ‘বাংলাকে ভারত সেরা করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের’ ডাক
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘গত ১৫ বছরে রাজ্যে যা ঘটেছে, আমরা তা বদলানোর চেষ্টা করছি। আমাদের সরকার কিন্তু প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী বিধায়কদেরও আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। রাজ্যের উন্নয়ন করতে গেলে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মানব সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।’ শুক্রবার নিউ টাউনের কনভেনশন সেন্টার এ আয়োজিত নবনির্বাচিত বিধায়কদের অরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সমস্ত দলের বিধায়কদের এক সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে বাংলাকে ভারত সেরা করার জন্য আহ্বান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই সঙ্গে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টির জন্য কি ভূমিকা পালন করেছিলেন তা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এই বিধানসভাতেই নেওয়া হয়েছিল। আজ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় না থাকলে আমরা কেউ এখানে উপস্থিত থাকতে পারতাম না।’
নবনির্বাচিত ও প্রবীণ বিধায়কদের সংসদীয় রীতিনীতি এবং আইনসভার অভ্যন্তরীণ আচরণবিধি শেখাতে নিউ টাউনের কনভেনশন সেন্টারে শুরু হলো দুই দিনের বিশেষ ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি। শুক্রবার এই হাই-প্রোফাইল প্রশিক্ষণ শিবিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ নারায়ণ সিং, কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু, হরিয়ানার রাজ্যপাল অসীমকুমার ঘোষ এবং দেশের অন্য আটটি রাজ্যের বিধানসভার স্পিকাররা।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতাও। এই মঞ্চ থেকেই রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি পূর্বতন সরকারগুলোকে তীব্র নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘এখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা আগে এতটা খারাপ ছিল না। বামেদের ৩৪ বছর সব সিদ্ধান্ত তো পার্টি অফিস থেকে হত, বিধানসভার কোনও ভূমিকাই ছিল না। আর গত পনেরো বছরে যা হয়েছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আজ কোনও কটু কথা বলতে চাই না, তবে কিছু রূঢ় বাস্তব আমাদের মেনে নিতেই হবে। রাজ্যে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল যেখানে বিরোধী দলের বিধায়ক ও সাংসদদের কোনও মূল্যই ছিল না। এমনকি থানার ওসি-আইসিরাও তাঁদের পাত্তা দিত না; সব ক্ষেত্রেই শুধু রাজনৈতিক পরিচয় দেখা হত। আর তৃণমূল আমলের বিগত ১৫ বছরের যে অবস্থা, তা আজ আর নতুন করে এই মঞ্চে বলতে চাই না। যারা প্রথমবার বিধায়ক হয়ে এসেছেন, তাদের সংসদীয় রাজনীতির অনেক কিছু শেখার থাকে। এই ধরনের ওরিয়েন্টেশন কর্মশালাগুলো থেকেই সেই সমস্ত নিয়মকানুন শিখতে হবে। আমি নিজে চার বারের বিধায়ক এবং দু’বারের সাংসদ ছিলাম। কিন্তু এর আগে বিরোধী দলনেতা হিসেবে রাজ্যের কোনো প্রশাসনিক বৈঠকে আমি ডাক পাইনি। বিগত সরকারের জমানায় প্রশাসনিক বৈঠকগুলোতে বিরোধী দল বা তাদের বিধায়কদের সম্পূর্ণ ব্রাত্য রাখা হতো।’
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তিনি সেই ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’র অবসান ঘটিয়েছেন দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত দেড় মাসে আমি যে ক’টি প্রশাসনিক বৈঠক করেছি, তার প্রতিটিতে দলমত নির্বিশেষে বিরোধী দলের বিধায়কদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছি এবং অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তাঁদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনেছি।’


‘মুখ্যমন্ত্রীর দূরদৃষ্টি রয়েছে’ লোকসভার অধ্যক্ষ
দু’দিনব্যাপী ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা করলেন লোকসভার অধ্যক্ষ। একই সঙ্গে সুশাসনের উপরে জোর দিয়ে ওম বিড়লা বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীর দূরদৃষ্টি রয়েছে। তিনি গণতন্ত্র মজবুত করার কাজ করছেন। এই রাজ্য আধ্যাত্মিকতার মাটি। উদ্যোগ, শিক্ষা, চেতনার মাটি। গোটা দেশ পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের পাশেই রয়েছে কেন্দ্র
ন্যাশনাল ই-বিদান অ্যাপ্লিকেশন প্রকল্পের আওতায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে ১০০ শতাংশ আর্থিক সাহায্য দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। শুক্রবার নিউটাউনে পশ্চিমবঙ্গের বিধায়কদের ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির উদ্বোধনের ফাঁকে সাংবাদিকদেরর এ কথা জানান কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। রিজিজু জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্র ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সঙ্গে একটি সমঝোতা মউ স্বাক্ষর করেছে। তিনি বলেন, ‘সংসদ বিষয়ক মন্ত্রকের তরফে ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান অ্যাপ্লিকেশন’ উদ্যোগের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এই প্রকল্পে ১০০ শতাংশ আর্থিক অনুদান দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।’
বিধায়ক প্রশিক্ষণ থেকে ওয়াকআউট কুনালের
প্রশিক্ষণ শিবিরের সূচনায় বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন কালীঘাট তৃণমূলের অন্যতম নেতা তথা বিধায়ক কুণাল ঘোষ। বিধায়কদের জন্য নির্দিষ্ট ডেলিগেট কার্ডও সংগ্রহ করেন তিনি। তার পরেই বেরিয়ে যান তিনি। অবশ্য এই ধরনের প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।
বেরিয়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে কুণাল বলেন, ‘প্রশিক্ষণ শিবিরে আসাটা আমার কর্তব্য ছিল। বিধায়ক হিসাবে এসেছিলাম। ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যাওয়াটা আমার সিদ্ধান্ত।’ তার পরেই লোকসভা এবং বিধানসভার স্পিকারকে নিশানা করে তাঁর সংযোজন, ‘সংসদে তৃণমূলকে ভাঙার খেলায় যুক্ত রয়েছেন স্পিকার ওম বিড়লা। অন্য দলে মিশে যাওয়া সাংসদদের বরখাস্ত না-করে উনি গ্রুপ ছবি তুলছেন। আর বিধানসভার স্পিকার বেইমানগুলোকে অনুমোদন দিয়েছেন। এঁদের কাছে সংসদীয় রাজনীতি, নিয়মকানুন, শিষ্টাচার শিখব না।’ বিকল্প কোন উপায়ে পরিষদীয় রীতিনীতি সম্পর্কে সড়গড় হবেন, তা-ও জানিয়েছেন প্রথম বারের বিধায়ক কুণাল। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে রাজ্যের স্পিকার পদে থাকা বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় এখন আমার সহকর্মী। তাঁর কাছ থেকেই পরিষদীয় রাজনীতি, নিয়মনীতি, শিষ্টাচার শিখে নেব।’