সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ইতিহাস গড়লো বাংলা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাংলায় বিনিয়োগের নবজাগরণ হয়েছে বলে বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের প্রথম দিনেই দাবী করেছিলেন ভারতবর্ষের এক নম্বর শিল্পপতি মুকেশ আম্বানি। মুকেশ আম্বানির সেই দাবি যে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি তা প্রমাণ করলো অষ্টম বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন।
তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প থেকে শুরু করেই ইস্পাত শিল্প এবং তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরীর ঘোষণা থেকে শুরু করে হোটেল এবং বড় মাপের হাসপাতাল তৈরির জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পাশাপাশি পোল্ট্রি এবং মৎস্য শিল্প এলো বিপুল বিনিয়োগ।
অষ্টম বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের দ্বিতীয় তথা শেষ দিনে তাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, “আমি জানি সবাই একটাই কথা জানার অপেক্ষায় রয়েছেন। তা হল, কত কোটি টাকার লগ্নি প্রস্তাব এল। সাংবাদিকরা তা শুনতেই এখানে বসে আছেন। বাণিজ্য সম্মেলনের প্রথম দিন অর্থাৎ গতকাল শিল্পপতিরা যেসব অঙ্গীকার করছেন হিসেবে ধরছি না। মুকেশ আম্বানি নিজেই বলেছেন এক লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ করবেন। মুকেশজি এবং সজন জিন্দালের সঙ্গে পৃথকভাবে আমার কথা হয়েছে। সজ্জন জিন্দাল আরও একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের কথা জানিয়েছেন। অন্ডাল বিমানবন্দরের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের তাদের আগ্রহ রয়েছে।”

গত সাতটি বাণিজ্য সম্মেলনে মোট ১৯.৫ লক্ষ্য কোটি টাকা লগ্নি প্রস্তাব এসেছে বলে জানান মমতা। ১৩ লক্ষ কোটি টাকার কাজ ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। আরও ৬ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রক্রিয়া চলছে। বাণিজ্য সম্মেলনে মোট ৪ লক্ষ ৪০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকার লগ্নির প্রস্তাব এসেছে। এবারের বাণিজ্য সম্মেলনে মোট ২১২টি মৌ স্বাক্ষর হয়েছে। ৫ হাজার লগ্নিকারী এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সামিল হয়েছিলেন ২০ দেশের প্রতিনিধিরা।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, “মহিলা কর্মসংস্থানে আমরা এগিয়ে। আমাদের একাধিক সামাজিক প্রকল্প সাধারণ মানুষকে সুবিধা দিয়েছে। আমাদের সাফল্য আমরা ১ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষকে দরিদ্র সীমার উপরে আনতে পেরেছি। ২০১১ সাল থেকে আমাদের এখানে বেকারত্ব কমছে। আমরা ড্রপ আউট রেট কমিয়ে ফেলেছি।”

বাংলাকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে বলে দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আগামী দিনে বাংলা দেশের এক নম্বর শিল্প বিনিয়োগের জায়গা হবে। এমএসএমই থেকে মহিলা কর্মসংস্থান-সবেতে আমরা এক নম্বরে। বাংলায় দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যায়। আমরা কেন বাণিজ্য সম্মেলন করেছিলাম? অনেকে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আজ তাঁরাই আমাদের দেখে এরকম বাণিজ্য সম্মেলন করছেন। আমরা যুবদের জন্য এটা করছি। আমরা কর্মসংস্থান গড়ছি। তাই এই সম্মেলন সাধারণ মানুষের। আমার সরকার সাধারণ মানুষের। বাংলায় পুনরায় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।” বাংলায় জমি জট নেই বলে দাবি করে তাঁর সরকারকে শিল্পবান্ধব বলেও দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের সমাপ্তি অনুষ্ঠান মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অষ্টম বিশ্ববিঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে অভূতপূর্ব সাফল্য। আজ দিনটা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের। গতকাল রাজ্যে বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন বড় বড় শিল্পপতিরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর মুকেশ আম্বানিজি ও সজ্জন জিন্দালজির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেছি। তাঁরা আরও অনেক কিছুর আশ্বাস দিয়েছেন, যা তাঁরা বাংলার জন্য় করতে চলেছেন এবং সেটা খুব তাড়াতাড়ি হবে। আমি খুবই খুশি। আজও কিছু দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করলাম। এমনকী, তাঁরা কেনিয়া থেকে ইউকে, আরও অনেক দেশ আশ্বাস দিয়েছে, তাদের দেশের যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমরা মানুষের মধ্যে বিভাজন করি না, ঐক্যবদ্ধ করি। বাংলা ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। ৫ হাজারেরও বেশি বিনিয়োগকারী বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। ২১২ মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে।”
মমতা অতিথিদের বলেন, “আবার আসবেন। আপনাদের টিম পাঠাবেন। আমরা আমাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে চাই। আমরা চাই ঐক্য। আমরা সকলে মিলে এই পৃথিবীতে একসঙ্গে থাকতে চাই। বেকারদের চাকরি দেওয়ার কাজ আমরা চালিয়ে যাব।”
বুধবার বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের (বিজিবিএস) মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, বুধবার ‘লাকি’ ডে। তাই এদিন-ই তিনি দেউচা পাঁচামিতে খননের কাজ শুরুর ঘোষণা করলেন। যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে ব্যাসল্ট খননের কাজ শুরু হয়েছে। তাঁর দাবি, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লাখনি হল দেউচা পাঁচামি। আর সেই কয়লাখনির কারণে ১০০ বছরে বিদ্যুতের কোনও সমস্যা হবে না। দেখা দেবে না বিদ্যুতের সংকট।

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যে সমস্ত প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হল অশোকনগরের তৈল উত্তোলনের প্রকল্প। আমরা ওএনজিসিকে জমি দিয়েছি। তারা সাফল্যের সঙ্গে তেলের সন্ধান পেয়েছে। গ্যাসেরও সন্ধান পেয়েছে। এগুলি বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা হবে। আমরা ওএনজিসিকে সবরকমভাবে সহযোগিতা করছি। পেট্রোলিয়াম খননের ক্ষেত্রে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি। ভারতের পেট্রোলিয়ামের মানচিত্রে এবার বাংলা থাকবে। তিনি জানিয়েছেন, ১ টাকায় ৫০ একর জমি দেওয়া হয়েছে।