সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন ।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন এক উদ্যোগ ঘোষণা করলেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ভিনরাজ্যে গিয়ে অত্যাচারিত হওয়া ও কাজ হারিয়ে ফেরা বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন করা।
গত কয়েক মাস ধরে বারবার শোনা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকরা ভাষা ও পরিচয়ের কারণে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। এমনকি তাঁদের অনেককেই বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করে অত্যাচার করার অভিযোগ উঠেছে। সেই পরিস্থিতিতেই মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
শ্রমশ্রী প্রকল্পে কী সুবিধা মিলবে?
মুখ্যমন্ত্রী নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, বাংলায় ফিরেই শ্রমিকরা একাধিক সুবিধা পাবেন।
1. এককালীন ভাতা – বাংলায় ফিরে আসার পরপরই প্রতিটি শ্রমিককে ৫০০০ টাকা এককালীন সহায়তা দেওয়া হবে।
2. মাসিক ভাতা – নতুন কাজ না পাওয়া পর্যন্ত ১২ মাস ধরে প্রতিমাসে ৫০০০ টাকা করে দেওয়া হবে।
3. সরকারি প্রকল্পের সুবিধা – স্বাস্থ্যসাথী, খাদ্যসাথী সহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা পাওয়া যাবে।
4. কাজের সুযোগ – দক্ষতা যাচাই করে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মশ্রী প্রকল্পের আওতায় কাজে যুক্ত করা হবে।
5. পরিবারের সুবিধা – যদি কারোর নিজস্ব বাড়ি না থাকে, তবে কমিউনিটি কিচেনে থাকার ব্যবস্থা ও সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ করে দেবে রাজ্য।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন বলেন: “বিভিন্ন রাজ্যে, যেখানে ডবল ইঞ্জিন সরকার আছে, সেখানে বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয়ের উপর পরিকল্পতভাবে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। কেউ বাংলায় কথা বললে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন: “এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য, পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলায় ফিরিয়ে আনা এবং তাঁদের জীবিকার জন্য, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সাহায্য করা। যাঁরা ফিরে আসবেন, এককালীন ভ্রমণ সহায়তা-সহ আমরা পাঁচ হাজার টাকা দেব। ফিরে আসার পর, বারো মাস, অর্থাৎ এক বছর, নতুন কাজে ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত প্রতিমাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।”
কেন প্রয়োজন শ্রমশ্রী প্রকল্প?
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বর্তমানে প্রায় ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের অনেকেই অত্যাচারিত হয়ে রাজ্যে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার ফিরে এসেছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, “প্রায় ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে বেশিরভাগ হেনস্থার স্বীকার হয়েছে। বাংলার বাইরে যারা পরিযায়ী শ্রমিক, যাদের জন্য তাদের পুনর্বাসনের জন্য একটা পরিকল্পনা করেছি – ‘শ্রমশ্রী’।’’
শ্রমশ্রী প্রকল্পের আবেদন প্রক্রিয়া
যাঁরা এই প্রকল্পের সুবিধা নিতে চান, তাঁদের শ্রমশ্রী পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। আবেদনকারীদের শ্রম দফতরের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হবে এবং একটি পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। এছাড়াও জেলা প্রশাসন – যেমন DM, BDO ও IC – এই কাজের দায়িত্বে থাকবেন।
অন্যান্য প্রকল্পের ধারাবাহিকতা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করিয়ে দেন, করোনা পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার ‘প্রচেষ্টা’, ‘সমর্থন’, ‘স্নেহের পরশ’-এর মতো একাধিক উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প।
তিনি বলেন: “আমাদের যে পোর্টাল আছে, তা অনুযায়ী, আমাদের এখানে ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক আছে। কিন্তু বাংলার বাইরেও অন্যান্য রাজ্য থেকে আমাদের রাজ্যে প্রায় দেড় কোটি পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছে। যারা অসহায় অবস্থায় রয়েছেন, অত্যাচারিত হয়ে ফিরে আসছেন, ভাষা সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের পুনর্বাসনের জন্যই এই প্রকল্প।”
রাজনৈতিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প একদিকে যেমন বাঙালি পরিচয়ের উপর আক্রমণের প্রতিবাদ, অন্যদিকে শ্রমিকদের প্রতি মমতা সরকারের মানবিক মুখকে তুলে ধরে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঘোষণার রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়: “কাল শুনলাম অন্ধ্র প্রদেশে একজন খুন হয়েছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য যারা ফিরে আসবে তাদের ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। যত দিন না পর্যন্ত কাজ পাচ্ছেন প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা করে দেব। তাছাড়া কারোর প্রশিক্ষণ দরকার হলে আমরা প্রশিক্ষণ দেব।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষিত ‘শ্রমশ্রী প্রকল্প’ নিঃসন্দেহে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে যে শ্রমিকরা ভিনরাজ্যে গিয়ে হেনস্থা, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন, তাঁদের জন্য এই প্রকল্প একটি নিরাপদ ছায়া দেবে।
বাংলার শ্রমিকদের পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই প্রকল্প বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার প্রতীক হিসেবেও উঠে এসেছে।