সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
যুবভারতী স্টেডিয়ামে আর্জেন্টাইন মহা তারকা লিওনেল মেসিকে দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেও দেখতে না পেয়ে স্টেডিয়াম ভাঙচুর এর ঘটনায় গ্রেপ্তারির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো পাঁচ। গতকালে গভীর রাতে প্রথমে দুজনকে গ্রেফতার করে বিধান নগর পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ভাংচুরের ঘটনায় গ্রেফতার হয় শুভ্রপ্রতিম দে ও গৌরব বসু। এরপরই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গ্রেফতার করা হয় আরো তিনজনকে। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর-সহ একাধিক অভিযোগে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে পুলিশ। দুই যুবককে গ্রেফতার করল বিধাননগর দক্ষিণ থানার পুলিশ। ধৃতদের নাম শুভ্রপ্রতিম দে, গৌরব বসু, সুদেব দাস, সঞ্জয় দাস, অভিজিৎ দাস।
গত শনিবার মেসির কনসার্টে ফুটবলের আইকনকে দেখতে না পেয়ে তান্ডব চলে যুবভারতী স্টেডিয়ামে। এর আগে লিওনেল মেসির ‘গোট ইন্ডিয়া ট্যুর ২০২৫’-কে কেন্দ্র করে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার ঘটনায় অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক শতদ্রু দত্তকে গ্রেফতার করে। গতকালই শতদ্রুকে বিধাননগর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বিশৃঙ্খলার ঘটনার পর বিধাননগর পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে শতদ্রু দত্ত ও অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দু’টি মামলা রুজু করেছে। অভিযুক্ত শতদ্রু দত্তকে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। শনিবার লিওনেল মেসির সঙ্গে কলকাতা থেকে হায়দরাবাদে যাওয়ার কথা ছিল শতদ্রুর। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। এদিকে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বিশৃঙ্খলার ঘটনার পর গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। ওই কমিটির সদস্য মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ এবং স্বরাষ্ট্রসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী রবিবার সকালে সল্টলেক স্টেডিয়ামে গিয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। পাশাপাশি গতকাল ঘটনাস্থলে যান রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। পুলিশ ও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, গোটা ঘটনার দায় কার ওপর বর্তাবে এবং কীভাবে এমন বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হল, তা খতিয়ে দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শুভশ্রীকে আক্রমণে থানায় অভিযোগ
শনিবার যুবভারতীতে উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী শুভশ্রী। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধি হিসেবেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই উপস্থিতিই যেন অভিশাপ হয়ে গেল। নিজের সোশ্যাল মিডিয়াতে ছবি পোস্ট করার পর মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াতে তীরের বেগে ছুটে এল ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ আর কদর্য মিম। এই অবস্থায় পাশে দাঁড়ালেন পরিচালক-অভিনেতা ও বিধায়ক স্বামী রাজ চক্রবর্তী। টিটাগড় থানায় শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে নেটদুনিয়া জুড়ে কুরুচিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানালেন রাজ চক্রবর্তী। রাজ এই বিষয়ে জানিয়েছেন টিটাগড় থানায় অভিযোগ জানাতে বাধ্য হয়েছেন তিনি কারণ একজন মহিলাকে যে ভাবে অপদস্থ হতে হয়েছে শুধুমাত্র ছবি তোলার জন্য তাঁর প্রতিবাদ জানানো দরকার ছিল। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক উস্কানি রয়েছে তাই আর কাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে সেই বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি তিনি।
৬টি সংস্থার প্রতিনিধিকে তলব
যুবভারতী স্টেডিয়ামে বিপর্যয়ের ঘটনায় ছ’জনকে তলব করেছে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট। তাঁরা ছ’টি পৃথক সংস্থার প্রতিনিধি। তাঁদের মধ্যে শতদ্রু দত্তের সংস্থার কর্তারাও রয়েছেন বলে খবর। মঙ্গলবার তাঁদের থানায় হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। বিধাননগর পুলিশ সূত্রে খবর, যাঁদের তলব করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই শনিবারের অনুষ্ঠানের সঙ্গে কোনও না কোনও ভাবে জড়িত ছিলেন। ওই ছয় সংস্থা কোনও না কোনও দায়িত্বে ছিল। অনুষ্ঠানে জল ও ঠান্ডা পানীয় সরবরাহের দায়িত্বে যারা ছিল, টিকিট বিতরণের দায়িত্বে যারা ছিল, তাদের প্রতিনিধিকেও তলব করেছে পুলিশ। টিকিট সরবরাহকারী সংস্থাকে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে বলেছে পুলিশ। শতদ্রুর সংস্থার কাছে যাতে টাকা না পৌঁছোয়, তাও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আয়োজনে তাঁদের ভূমিকা কী ছিল, তাঁদের তরফে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, খতিয়ে দেখা হবে।
কিন্তু যে যুবভারতীতে দর্শকদের জলের বোতল নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ, সেখানে এত এত প্লাস্টিকের বোতল এল কোথা থেকে? এই প্রশ্ন বারবার উঠছে। অনুষ্ঠানের আগেও শুক্রবার বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়, মাঠে বোতল নিয়ে ঢোকা যাবে না। অনীশ সরকার, ডিসি, বিধাননগর সাংবাদিক বৈঠকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘স্টেডিয়ামের ভিতরে পর্যাপ্ত পরিমাণ জলের ব্য়বস্থা থাকবে। জল কেউ প্লিজ আনবেন না। কোনও জলের বোতল যদি আমরা গেটে দেখি, তাহলে আমরা সেই জলের বোতলটা অ্যালাও করতে পারব না।’ পুলিশ গ্যালারিতে জলের বোতল নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ করলেও, সল্টলেক স্টেডিয়ামে স্টল বসিয়ে পানীয় জলের বোতল ও খাবার বিক্রির অনুমতি দিল কে? গতকাল লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানে দর্শকাসন থেকে জলের বোতল উড়ে আসার পর থেকেই এই প্রশ্ন জোরাল হয়েছে।
শনিবার যুবভারতী স্টেডিয়ামে ধরা পড়ে একেবারে উল্টো ছবি। অভিযোগ, ২০ টাকার জলের বোতল বিক্রি করা হয়েছে ২০০ টাকায়। শুধু জল নয়। অভিযোগ, খাবারও বিক্রি করা হয়েছে চ়ড়া দামে। শনিবার গ্য়ালারিতে যে জলের বোতল ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, রবিবার সেই বোতলই জলের দরে বিক্রি করতে চাইলেন টেন্ডার পাওয়া সংস্থা। এদিকে স্টেডিয়ামে জলের বোতল বিক্রির ভিডিও দেখিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। যুবভারতীতে বিশৃঙ্খলা নিয়ে সমালোচনা শোনা গেছে তৃণমূলের একাংশের মুখে। সূত্রের খবর, শনিবার বিশৃঙ্খলার জেরে যুবভারতীতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি ছাড়িয়েছে। এর দায় কার? কীভাবে জলের বোতল মাঠে ঢুকল, প্রশ্ন তুলেছেন কলকাতা পুরসভার ডেপুটি মেয়র ও তৃণমূল বিধায়ক অতীন ঘোষও। প্রশ্ন তুলেছেন পুলিশের ভূমিকা নিয়েও।
মেসি এসেছিলেন সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি’পলকে নিয়ে। ভিড়ের ধাক্কাধাক্কিতে সুয়ারেজের পেটে কনুইয়ের গুঁতো লাগে। হাতে নখের আঁচড় লাগে ডি’পলের। অত্যন্ত অস্বস্তি নিয়ে মাঠ ছাড়েন তাঁরা। মেসিকে বার করে নিয়ে যান তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা। এরপরেই ক্রুদ্ধ জনতা যুবভারতীতে ভাঙচুর চালায়। চেয়ার উপড়ে ছোড়া হয় মাঠে। হাজারো মানুষ মাঠের ভিতর ঢুকে পড়েন। পুলিশকে তাড়া করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছিল। এই ঘটনার তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার রায়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কমিটিতে আছেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, স্বরাষ্ট্রসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীরা। রবিবার যুবভারতীর ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন তাঁরা। নমুনা সংগ্রহ করেছেন। হয়েছে ভিডিওগ্রাফি। দীর্ঘক্ষণ স্টেডিয়ামের ভিতরে বৈঠক করেছে তদন্ত কমিটি। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে প্রাক্তন বিচারপতি জানান, তদন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে। কমিটির রিপোর্টে তাঁদের অনুসন্ধানের ফলাফল বিশদে উল্লেখ থাকবে।