সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
যাদবপুর কাণ্ডে কঠোর অবস্থান কলকাতা হাইকোর্টের। আহত ছাত্র ইন্দ্রানুজ রায়ের অভিযোগ এফআইআর হিসাবে নিতে হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। একইসঙ্গে রাজ্যের কাছে রিপোর্ট চাইল আদালত। প্রসঙ্গত, যাদবপুরের অচলাবস্থা থেকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দফায় দফায় মামলা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে। অচলাবস্থা কাটিয়ে যাদবপুরকে সচল করার দাবিতে জনস্বার্থ মামলা করেন আইনজীবী অর্ক নাগ। তাঁর দাবি, ছাত্রদের আন্দোলেনের জন্য আপাতত বন্ধ হয়ে রয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। আসছেন না উপাচার্য। যদিও এই মামলায় এখনই হস্তক্ষেপ চায়নি আদালত। এদিন এই মামলা উঠেছিল প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে। প্রধান বিচারপতির স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, “রাজ্যকে পদক্ষেপ করতে দিন। আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের বিষয়। রাজ্যের নির্দিষ্ট ক্ষমতা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্ষমতা আছে।” যদিও একইসঙ্গে এও বলেন, “আমরা এখানে বসে নেই তাদেরকে জানাতে কী ক্ষমতা আছে”।
প্রধান বিচারপতির কাছে এই মামলার প্রাথমিক শুনানি হওয়ার পাশাপাশি আরও একটি মামলার শুনানি হয় বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে। যাদবপুরকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের। ‘পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে না। কোনও ঘটনায় অতি সক্রিয়, আবার কোনও ঘটনায় নিষ্ক্রিয় থাকছে পুলিশ। ‘ এই অভিযোগ নিয়ে বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে একটি মামলা দায়ের হয় ছাত্রদের একাংশের তরফে।
সেই মামলার শুনানিতেই বিচারপতির স্পষ্ট নির্দেশ, ইন্দ্রানুজ রায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে আজ অর্থাৎ বুধবারের মধ্যে এফ আই আর গ্রহণ করতে হবে পুলিশকে। বিচারপতি প্রশ্ন করেন, একপক্ষের বয়ানের ভিত্তিতে অভিযোগ দায়ের হয়েছে, অপরপক্ষের বয়ান কোথায়? রাজ্যের রিপোর্ট তলব করেছেন বিচারপতি ঘোষ। আগামী ১২ মার্চের মধ্যে রাজ্যের রিপোর্ট তলব করেছে আদালত।
বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের পর্যবেক্ষণ, এই ঘটনা সহজেই এড়ানো যেত। বিচারপতি বলেন, ‘ সাদা পোশাকে পুলিশ তো থাকেই। অনেক কাজই আপনারা করেন যেটার অনুমতি থাকে না। পুলিশের গা ছাড়া মনোভাবের জন্য এই বিপত্তি।’ বিচারপতির প্রশ্ন, ‘স্পেশাল ব্রাঞ্চ এর আধিকারিকরা কেন থাকেন ? এই মামলায় আমি স্পেশাল ব্রাঞ্চকেও যুক্ত করব।’
এই ঘটনা গোয়েন্দা বিভাগের ব্যর্থতা বলে মনে করছেন বিচারপতি ঘোষ। ব্রাত্য বসুর মিটিংকে কেন্দ্র করে যে এতবড় গোলযোগ বাঁধতে পারে, গোয়েন্দারা কি মন্ত্রীকে এ বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন ? মন্ত্রী কি সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিলেন ? মন্তব্য বিচারপতির। তিনি বলেন, এই সব এখন থেকে লিখিত আকারে হওয়া দরকার, নইলে পুলিশ সমস্যায় পড়বে। পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করে বিচারপতি বলেন, ‘ নিরাপত্তা প্রাপ্ত ব্যক্তির কাছাকাছি যদি বিক্ষোভকারীরা চলে আসেন সেক্ষেত্রে সমস্যা হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মতো যেন না হয়। এটা যদি উদাহরন হয় তাহলে কিন্তু গোটা রাজ্যে এটা ছড়িয়ে পড়বে।’
দুপক্ষকেই দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন বিচারপতি। বলেন, মানুষ একবার বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লে সামলাতে সময় লাগবে। এছাড়া আদালত মনে করছে, ‘যদি কেউ সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে তাহলে সেটা লিখিত আকারে হতে হবে। সামনে ভোট আসছে, সমস্যা কিন্তু বাড়বে।’
গত শনিবারের গন্ডগোলের পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন শিকেয় উঠেছে। ফের যাতে সেখানে পড়াশোনা শুরু হয়, সেই বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়ে একটি জনস্বার্থ মামলা রুজু করা হয়েছিল। গত শনিবারই এই মামলা রুজু করা হয়। যার শুনানি হওয়ার কথা আগামিকাল (৬ মার্চ, ২০২৫)। কিন্তু, বুধবারই সেই মামলাটি নিয়ে ফের আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্য়ায়ের বেঞ্চ বুধবার সাফ জানিয়ে দেয়, আইনজীবী অর্ক নাগের রুজু করা সেই মামলার জরুরি শুনানি সম্ভব নয় (আবেদনকারী মামলার জরুরি বা দ্রুত শুনানি চেয়েছিলেন)। আদালত আরও জানায়, রাজ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিজস্ব আইন থাকে এবং বিশেষ প্রয়োজনে রাজ্যও হস্তক্ষেপ করতে পারে। তাদের সেই বিশেষ অধিকার আছে। কাজেই এই মামলাটির ক্ষেত্রে কলকাতা হাইকোর্ট কোনও হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যা করার রাজ্যকেই করতে হবে। এবং রাজ্যের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার দায় কলকাতা হাইকোর্টের নেই।
পাশাপাশি, প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ এও জানায়, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে থাকে, তাহলে সেটা সামাল দেওয়ার কাজ পুলিশ প্রশাসনের। মামলাকারী আইনজীবী এক্ষেত্রে আদালতকে জানান, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল জোর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে সমস্যা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তার উত্তরেও প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বলে, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়। প্রয়োজনে রাজ্য সরকার এক্ষেত্রে আইনানুগ পদক্ষেপ করতে পারে।