সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার দুর্গা পুজো কমিটি গুলোকে রাজ্য সরকার যে সরকারি অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে তার মধ্যে বেআইনি কিছু নেই। আর মামলাকারীরা পুজো কমিটির তরফে হিসেব পেশ না করার যে অভিযোগ তুলেছিল তা খুঁজতে গেলে মাইক্রোস্কোপ আনতে হবে হাইকোর্টে। তাই পুজো অনুদান বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করছে না কলকাতা হাইকোর্ট। সিপিএমের জায়ের করা মামলা খারিজ করে এমন রায় দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ।
২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সাল। প্রত্যেক বছর দুর্গাপুজোর ঠিক আগে নিয়ম করে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন সিপিএমের জনাকয়েক কমরেড। আর তাদের হয়ে বাংলার দুর্গা পূজাকে রাজ্য সরকারের দেওয়া সরকারি অনুদান বাতিল করানোর জন্য আদা জল খেয়ে এবং অবশ্যই মোটা টাকা আইনজীবী ফি নিয়ে মমতার বিরুদ্ধে লড়তে নেমে পড়েন সিপিএম নেতা বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। আর প্রত্যেকবারই কলকাতা হাইকোর্টে গোহারান হেরে ঘুরে আসেন সুপ্রিম কোর্ট থেকেও। একইভাবে প্রত্যেক বছরই হেরে যান সুপ্রিম কোর্টেও। কিন্তু তারপরেও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে!
জনস্বার্থের মামলার নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করে কলকাতা হাইকোর্টে সিপিএমের এক কমরেড দাবি করেছিলেন সরকারি কোষাগার থেকে রাজ্য সরকার দুর্গা পুজো কমিটি গুলিকে প্রত্যেক বছর পুজোর জন্য যে সরকারি অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং সংবিধান বিরোধী। যদিও রাজ্য সরকার স্পষ্টভাবে হলফনামা দিয়ে হাইকোর্টে এবং সুপ্রিম কোর্টে জানিয়ে দেয় রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প প্রচারের পাশাপাশি ইউনেস্কো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক হেরিটেজ বাংলার দুর্গা পুজোকে বিশ্বের দরবারে আরো ভালো করে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। রাজ্য সরকারের সেই বক্তব্য সম্পূর্ণ সঠিক বলে এর আগেও মেনে নিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট। তবে এবারে নতুন বোতলে পুরনো মদের মতো বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য এবং তার অ্যাসিস্ট্যান্ট শামীম আহমেদ কলকাতা হাইকোর্টে মামলাকারী সৌরভ দত্তের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে দাবি তোলেন কলকাতা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারকে যে নির্দেশ দিয়েছিল সরকারি অনুদান কিভাবে খরচ করা হলো তার ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট জমা দেয় না প্রায় কোন পূজো কমিটি। এই টাকা নাকি তৃণমূলের নেতাদের পকেটে চলে যায়। কিন্তু রাজ্য সরকারের পক্ষে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত বিকাশ শামীমের এমন উদ্ভট সওয়াল উড়িয়ে দিয়ে আজ লিখিত রিপোর্ট বিচারপতিদের সামনে পেশ করে জানিয়ে দেন, অনুদানের ওই অর্থ পুলিশ মারফত পুজো কমিটিগুলির কাছে পৌঁছয়। ৪১,৭৯৯টি ক্লাবের মধ্যে তিনটি ক্লাব খরচের হিসাব দেয়নি। ওই তিনটি ক্লাবই শিলিগুড়ির। জবাবে বিচারপতি সুজয় পালের মন্তব্য, সংখ্যাটা এত কম যে মাইক্রোস্কোপ লাগবে।
বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, আদালতের আগের নির্দেশ মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যে সব পুজো কমিটি সার্টিফিকেট দিয়েছে, তারাই অনুদান পাবে। পাশাপাশি, পুজোর ছুটির এক মাসের মধ্যে ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট বা খরচের হিসাব নিয়ে রাজ্যকে রিপোর্ট দিতে হবে।
রাজ্যের ওই রিপোর্টের বিরোধিতা করেন মামলাকারীর আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ওই সার্টিফিকেট জমা দেওয়া হয়নি। কলকাতা পুলিশের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা কোনও তথ্য দেয়নি।
রাজ্যের তরফে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, গত বছর কলকাতা পুলিশ এলাকায় ২৮৭৬ পুজো কমিটিকে অনুদান দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেকে খরচের হিসেব দিয়েছে। জেলা পুলিশের কাছ থেকে ৪১৭৯৫ পুজো কমিটি এই অনুদান গ্রহণ করেছে এবং ৪১৭৯২ পুজো কমিটি ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট দিয়েছে। শিলিগুড়ির ৩ পুজো কমিটি কোনও হিসেব জমা করেনি। এরপরই আদালত জানায় যারা নিয়ম মানবে না তাদের অনুদান দেওয়া হবে না। বাকিদের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের পুজো অনুদানে কোনও সমস্যা নেই।
হাইকোর্ট জানায়, আদালত কোনও সংখ্যার উপর যাচ্ছে না। আদালতের পূর্ব নির্দেশ মেনে বিগত বছরে যে সব কমিটি বা ক্লাব খরচের হিসাব দেয়নি, তারা অনুদান পাবে না।