শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
‘বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-কে জমি না দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের ঢুকিয়েছেন মমতা।’ জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে এমন বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এসআইআর প্রক্রিয়ার মাঝেই রাজ্যে এসেছে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি দল। শুক্রবার সেই দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের একাধিক অভিযোগ তুলে ধরে বিজেপি। এর নেতৃত্বে ছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
সেখানে শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সরকার। রাজ্যের মানচিত্র তুলে ধরে তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-কে জমি না দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের ঢুকিয়েছেন মমতা। তারাই এতদিন ধরে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। আর এইভাবে রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে গিয়ে আদতে দেশের সর্বনাশ করছে তৃণমূল সরকার। শুভেন্দুর স্পষ্ট অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব তাঁর প্রশাসন দেশের সর্বনাশ করছে। প্রশাসনের একাংশ অনুপ্রবেশকারীদের নাম ভোটার তালিকায় রেখে দিতে চাইছে বলেও অভিযোগ করেছেন। শুভেন্দু জানান, কমিশনের প্রতিনিধিদের কাছে ভোটার তালিকায় হিন্দু শরণার্থীদের নাম তোলার বন্দোবস্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁর কথায়, ‘হিন্দু শরণার্থীদের নাম তোলার ব্যবস্থা করতে হবে কমিশনকে। সেটা তাদের দায়িত্ব। নাম বাদ দিতে হবে অনুপ্রবেশকারীদের।’
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সফররত নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিদলের কাছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক অরুণ প্রসাদের সঙ্গে প্রায় প্রতি দিন ফোনে কথা বলছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! এবং কথা বলছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ পন্থের ফোন থেকে। শেষ যে দিন বিজেপির প্রতিনিধিদল রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করে, সে দিনও অরুণ ২০ মিনিট মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন বলে দাবি শুভেন্দুর। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তথ্যপ্রমাণও কমিশনের হাতে তুলে দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
পাশাপাশি, আইপ্যাকের সাহায্যে তৃণমূল ভুয়ো এবং মৃত ভোটারদের কার্ড কাজে লাগিয়ে ভোটব্যাঙ্ক বাঁচানোর চেষ্টা করছে বলে আগেই অভিযোগ করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এবার তাঁর দাবি, বিএলও-দের ভয় দেখানো হচ্ছে অনৈতিক কাজ করার জন্য। বিরোধী দলনেতা জানিয়েছেন, অনেক বিডিও (এইআরও, ডিএম) এই কাজ করছেন। সে ব্যাপারে কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছেন তাঁরা।
শুভেন্দু এও জানিয়েছেন, অধিকাংশ বিএলও সততার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু একাংশ রাজনৈতিক চাপে হোক কিংবা কিছু পাওয়ার আশায় তৃণমূল-আইপ্যাকের সঙ্গে মিলে দুর্নীতি করছেন। এমন ৬৭ জন বিএলও-দের বিরুদ্ধে কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছেন তাঁরা। তবে শুভেন্দু কমিশনের ভূমিকা নিয়েও খুব একটা সন্তুষ্ট নন। কারণ তাঁর দাবি, এদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর চিঠির পর এবার নির্বাচন কমিশনে পাল্টা চিঠি দিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে চিঠি লিখেছেন, তা আদতে কোনও গঠনমূলক কারণে নয়, অবৈধ ভোটব্যাঙ্ককে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। এমন বার্তাই কমিশনে পৌঁছে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেছেন তিনি। সেই চিঠিতে শুভেন্দু সম্প্রতি হাই কোর্টের নির্দেশে মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। বিরোধী দলনেতার বক্তব্য, শুধু ভোট চুরি করা নয়। মমতার রাজনৈতিক ধরন হল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেও চুরি করা। সে কারণেই হাই কোর্ট মুকুল রায়ের বিধানসভার সদস্যপদ বাতিল করে দিয়েছে। এসআইআরের চাপ সইতে না-পেরে দুই বিএলও-র মৃত্যু, মানুষের হেনস্থা, আলু তোলার মরসুমে এই প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়ার একাধিক অভিযোগ করেছেন মমতা। শুভেন্দু তাঁর চিঠিতে পাল্টা যুক্তির জাল বুনতে চেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বিএলওদের অর্থবৃদ্ধির ফাইল এখনও রাজ্যের অর্থ দফতর এখনও ফেলে রেখেছে। শুভেন্দুর অভিযোগ, ভুয়ো, অবৈধ ভোটার দিয়ে তালিকা ভরিয়ে রাখার স্বার্থেই মুখ্যমন্ত্রী এসআইআর প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে চিঠি লিখেছেন। শুভেন্দুর বক্তব্য, গত তিন মাস ধরে মুখ্যমন্ত্রী বারংবার বিএলওদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন, ভোটের পরে রাজ্য সরকারের চাকরিই তাঁদের করতে হবে। যা কমিশনের নির্দেশ পালনের বদলে রাজনৈতিক দাসত্ব পালনে প্ররোচনা দিয়েছে বলে অভিযোগ বিরোধী দলনেতার। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী মনোজ আগরওয়ালের বিরুদ্ধেও মমতা দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন। তা-ও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন শুভেন্দু।