সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
আমার লক্ষ্মী প্রতিবাদ জানায়, কন্ঠে তার আগুন,
আমার লক্ষ্মী দেশ জয় করে, সবারে বলে – জাগুন। এভাবেই আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ধর্মতলার ধরনা মঞ্চ থেকেই বাংলার নারী শক্তির জয়গান গাইলেন মমতা। নিজের লেখা কবিতায় তুলে ধরলেন বাংলার মেয়েদের প্রতিবাদী মানসিকতার ছবি আর সেই সঙ্গে ২০১১ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি বাংলার মেয়েদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রেও কি কি কাজ করেছেন তার খতিয়ান তুলে ধরলেন নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ধর্মতলায় ধরনার তৃতীয় দিনে আজ মমতা লেখেন,
“আমার লক্ষ্মী আজকের দিনে সবারে করে আহ্বান,
আমার লক্ষ্মী ক্লান্তি ভুলে গায় জীবনের জয়গান।।”
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভক্ষণে সারা বিশ্বের সবাইকে জানাই আমার অনেক শুভনন্দন।
আমি কুর্নিশ জানাই এই বাংলার মাটিকে – এ মাটি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মাটি, এ মাটি মাতঙ্গিনী হাজরার মাটি, এ মাটি কল্পনা দত্ত, বীণা দাশ, সুনীতি চৌধুরীর মাটি, এ মাটি মাদার টেরিজার মাটি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এই শুভক্ষণে একটা বিশেষ কাজ আমরা করেছি। ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে টাকা দেবার কথা ছিল আগামী এপ্রিল মাস থেকে। আজকের দিনে যুবসমাজকে সম্মান জানিয়ে গতকাল থেকেই ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের টাকা দেওয়া আমরা শুরু করেছি। গতকাল থেকেই প্রায় ১ কোটি আবেদনকারীর ব্যাঙ্ক একাউন্টে টাকা যাওয়া শুরু হয়ে গেছে। আমি সকলকে জানাই উষ্ণ অভিনন্দন।
আমরা সবসময় চেষ্টা করি এভাবেই সর্বস্তরের, সকল মানুষের পাশে থাকতে। আর অন্যদিকে, কেন্দ্র সরকারের কাজ শুধু মানুষকে হয়রানি করা। গ্যাসের দাম যেভাবে বৃদ্ধি করা হল, তার প্রভাব পড়বে মানুষের হেঁসেলে। আজ তাই বাংলার মেয়েরা প্রতিবাদে পথে নামবে, তাঁদের পরনে থাকবে প্রতিবাদের কালো শাড়ি।
“আমার লক্ষ্মী প্রতিবাদ জানায়, কন্ঠে তার আগুন,
আমার লক্ষ্মী দেশ জয় করে, সবারে বলে – জাগুন।।”
বাংলার প্রতিটি মেয়ে আমাদের গর্ব। সমাজের প্রতিটি স্তরে তাঁদের অবদান অপরিসীম।
তাই শুধুমাত্র বছরের একটি বিশেষ দিন নয়, আমার কাছে প্রতিটা দিনই নারী দিবস।
যে সমাজে মেয়েরা ভালো থাকে না, সেই সমাজ কখনো ভালো থাকতে পারে না।
তাই, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যাতে তাঁরা এগিয়ে যেতে পারে তা সুনিশ্চিত করতে আমাদের সরকার প্রথম দিন থেকে অনেকগুলি যুগান্তকারী কর্মসূচী নিয়েছে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে উপভোক্তার সংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪১ লক্ষ। ভাতার পরিমাণও আবার ৫০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে – তপশিলী জাতি ও আদিবাসী পরিবারের মহিলারা এখন মাসে ১৭০০ টাকা এবং অন্যান্যরা মাসে ১৫০০ টাকা করে পাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে স্মার্টকার্ডটি পরিবারের মহিলা সদস্যের নামে। প্রায় ২ কোটি ৪২ লক্ষ মহিলা এই কার্ড পেয়েছেন।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় – সব স্তরেই মেয়েরা কন্যাশ্রী পাচ্ছে। ১ কোটি ছাত্রী এখন কন্যাশ্রী। ইউনেস্কোতে সেরার শিরোপা পেয়ে ‘কন্যাশ্রী’ বিশ্বজয়ী।
রূপশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২৩ লক্ষ মহিলাকে বিবাহের জন্য এককালীন ২৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সবুজসাথী প্রকল্পে রাজ্যের ছাত্র-ছাত্রীদের ১ কোটি ৪৮ লক্ষ সাইকেল দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৭৯ লক্ষ মেয়েদের জন্য।
মা–বোনেদের ও শিশুদের স্বাস্থ্যরক্ষায় আমাদের সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ করা হয়েছে। মাদার এন্ড চাইল্ড হাব হয়েছে ১৭টি। গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ১৩টি ওয়েটিং হাট হয়েছে। এসবের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৬৮.১% থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৯.১৪%।
আজ নারী সুরক্ষায় বাংলা দেশের সেরা। কেন্দ্রীয় সরকারই বলছে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহর কলকাতা। এই নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করতে কদিন আগেই কলকাতা পুলিশের উদ্যোগে পিঙ্ক বুথ’ ও অল-উইমেন শাইনিং মোবাইল পরিষেবা শুরু করা হয়েছে। মেয়েরা রাতবিরেতে যাতে আরো সুরক্ষিত বোধ করে তার জন্যই আমাদের এই উদ্যোগ।
নারী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এর আগেও আমরা অনেক পদক্ষেপ করেছি। ‘অপরাজিতা বিল’ পাশ করা হয়েছে। ৪৯টি মহিলা থানা স্থাপন করা হয়েছে। ২০১১ সালের আগে কোন মহিলা থানা ছিল না।এছাড়া বিচার ব্যবস্থায় গতি আনতে মহিলাদের জন্য ৫২টি ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরি করা হয়েছে।
ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতে ৫০% মহিলা আসন সংরক্ষণ কার্যকর করেছি আমরা। এমনকি বিধানসভা, লোকসভা ও রাজ্যসভাতেও আমাদের মহিলা প্রতিনিধির সংখ্যা দেশের মধ্যে অগ্রগণ্য।
‘আনন্দধারা’ প্রকল্পের আওতায় ১.২১ কোটি মহিলাকে নিয়ে ১২ লক্ষেরও বেশি স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরী হয়েছে – সারা দেশে যা আর কেউ করতে পারেনি। নানা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের দক্ষতা বাড়ানো হচ্ছে এবং তাঁদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করে তাঁদের স্বনির্ভর করা হচ্ছে। আমাদের এই প্রকল্প দেশের মডেল।
রাজ্য সরকারী অফিস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চায়েত ও মিউনিসিপ্যালিটিতে কর্মরত মহিলা কর্মীদের জন্য আমরা ৭৩০ দিন সবেতন চাইল্ড কেয়ার লিভ মঞ্জুর করা হয়েছে।

‘কর্মাঞ্জলি’ প্রকল্পের আওতায় কর্মরত মহিলাদের থাকার জন্য বাংলা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ১৩টি হস্টেল। আমি এর নাম রেখেছি ‘কর্মাঞ্জলি’।
শেষে বলি –
“আমার লক্ষ্মী ঘরে ঘরে জ্বেলেছেন শুভ আলো,
আমার লক্ষ্মীরা ভালো থাকুক, হোক বিশ্ববাংলার ভালো।।
আমার লক্ষ্মী মা-মাটি-মানুষ, ভয়কে করেনা ভয়,
ওরা দুর্জয়, ওরা দুর্গম, ওরা দুরন্তর বরাভয়।।
আমার লক্ষ্মী ডানা মেলে কখনো হয় পক্ষী,
ওরাই মোদের পাহারাদার, ওরাই মোদের রক্ষী।।
আমার লক্ষ্মী চন্দ্র – সূর্য, আকাশে জ্বলে তারা,
আমার লক্ষ্মী ধন্য ধান্যে, নবান্নে দিয়ে ভরা।।”