সই জালিয়াতি বিতর্কে দলছুট দুই MLA, অভিষেক থেকে Ipac — কাউকেই রেয়াত করলেন না ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: বহিষ্কারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন রাজনৈতিক বিস্ফোরণ! তৃণমূল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিজেপিতে যোগ দেবেন কি না, সেই প্রশ্ন উঠতেই স্পষ্ট জবাব দিলেন উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই উত্তরেই নতুন করে জল্পনার ঝড় বঙ্গ রাজনীতিতে।
“বিজেপিতে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই নেই। আমি এখন হুইসেলব্লোয়ারের ভূমিকা নেব,”— সাংবাদিকদের সামনে এমনই ঘোষণা করেন ঋতব্রত। তাঁর দাবি, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় যে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য তাঁর কাছে রয়েছে, সেগুলি তিনি সরকারের কাছে তুলে ধরবেন এবং তদন্তের দাবি জানাবেন।
তৃণমূলের অন্দরে সই জালিয়াতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে। অভিযোগ, বিধানসভা সংক্রান্ত একটি নথিতে সই জাল করার ঘটনা সামনে আনেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা। এরপরই দলবিরোধী কাজের অভিযোগ তুলে দু’জনকেই বহিষ্কার করে তৃণমূল নেতৃত্ব।
কিন্তু বহিষ্কারের পর চুপ করে বসে থাকার বদলে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন ঋতব্রত। মঙ্গলবার বিধানসভার বাইরে দাঁড়িয়ে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন তিনি।
তাঁর দাবি, উলুবেড়িয়া পুরসভাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ জমা পড়েছে। বিশেষ করে সরকারি প্রকল্প ও নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কিছু নির্দিষ্ট সংস্থাকে ঘিরে বড়সড় প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে কি না, তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
ঋতব্রতের বক্তব্য, “আমার কাছে যে তথ্য রয়েছে, সেগুলো সরকারের কাছে জমা দেব। আমি বিচারক নই। কিন্তু তদন্ত হোক, সত্যিটা সামনে আসুক— সেটাই চাই।”
এখানেই থামেননি তিনি। তৃণমূলের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, দলটি এখন আর আগের জায়গায় নেই। একদল পরামর্শদাতা ও বহিরাগত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে দলের নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি চর্চায় এসেছে তাঁর সেই মন্তব্য, যেখানে তিনি দাবি করেন, “দলটা কার্যত হাইজ্যাকড হয়ে গিয়েছে।” যদিও কারও নাম সরাসরি না বললেও তাঁর বক্তব্য যে শীর্ষ নেতৃত্বকে অস্বস্তিতে ফেলেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
একইসঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করতেও পিছপা হননি ঋতব্রত। জনরোষ, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যাঁদের মানুষ রক্ষা করবে বলে দাবি করা হচ্ছে, তাঁদেরই আবার অতিরিক্ত নিরাপত্তার প্রয়োজন কেন— সেই প্রশ্নও উঠছে।
অন্যদিকে, গোটা ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রতিক্রিয়াও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, সই জালিয়াতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। আইন অনুযায়ী তদন্ত চলবে এবং তদন্তকারী সংস্থাই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবে। তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি দাবি করেন, সরকার আইনের পথেই এগোবে।

এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তি বাড়ছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ বহিষ্কৃত দুই বিধায়ক এখন শুধু দলের বিরুদ্ধে সরব নন, বরং একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে এনে নতুন বিতর্ক তৈরি করছেন।
এরই মধ্যে প্রবীণ রাজনীতিক তাপস রায়ও মন্তব্য করেছেন যে তৃণমূলের ভিতরে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, দলের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট এবং সেই প্রভাব আগামী দিনে আরও প্রকট হতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই— ঋতব্রত ও সন্দীপনের এই বিদ্রোহ কি শুধুই ব্যক্তিগত ক্ষোভ, নাকি এর পিছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণের ইঙ্গিত?
বাংলার রাজনৈতিক অন্দরে এখন সেই উত্তর খুঁজছে সবাই। কারণ এই বিতর্কের পর্দা যে এখনও পুরোপুরি নামেনি, তা বলাই বাহুল্য।