মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর বড় ঘোষণা আইটিসির। পর্যটন, শিল্প, সবুজ শক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নজিরবিহীন বিনিয়োগে চাঙ্গা বাংলার অর্থনীতি।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গে কি ফের শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে? রাজ্যের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বাজারে বড়সড় চমক এনে দিল দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী আইটিসি।
এক লাফে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে আইটিসি (ITC Investment in West Bengal)। আর এই বিনিয়োগ শুধু একটি প্রকল্পে নয়, ছড়িয়ে থাকবে পর্যটন, কাগজ শিল্প, নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে।
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (West Bengal Chief Minister) এবং আইটিসির চেয়ারম্যান সঞ্জীব পুরী (Sanjiv Puri)-র মধ্যে হওয়া উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই বিনিয়োগের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। সেই বৈঠকের পর থেকেই শিল্পমহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে পর্যটন খাতে আইটিসির আগ্রাসী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা। উত্তরবঙ্গের পাহাড় থেকে দক্ষিণবঙ্গের ম্যানগ্রোভ অরণ্য—সব জায়গাতেই নজর দিচ্ছে সংস্থাটি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দার্জিলিং (Darjeeling Tourism), কার্শিয়াং (Kurseong Tourism) এবং সুন্দরবন (Sundarbans Tourism)-এ বিশ্বমানের বিলাসবহুল হোটেল ও পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ইতিমধ্যেই পরিকল্পনাধীন আরও সাতটি হোটেল প্রকল্পের কাজও দ্রুত শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে না, স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহণ, হোমস্টে, রেস্তোরাঁ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের সঙ্গেও জড়িয়ে যাবে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা।
তবে শুধু পর্যটন নয়, উৎপাদন শিল্পেও বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে আইটিসি।
হুগলি (Hooghly Industry Project) জেলায় একটি নতুন কাগজ উৎপাদন প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্পমহলের একাংশের মতে, এর ফলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে রাজ্যের উৎপাদন ক্ষেত্রেও নতুন গতি আসবে।
অন্যদিকে সবুজ শক্তির উপর জোর দিয়ে পুরুলিয়া (Purulia Solar Power Project)-তে বড় মাপের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহারে দেশজুড়ে যে পরিবর্তন ঘটছে, পশ্চিমবঙ্গও সেই পথেই আরও এক ধাপ এগোতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে এই গোটা ঘোষণার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে প্রযুক্তি খাতের একটি বিশেষ উদ্যোগ।
রাজারহাট (Rajarhat AI Hub)-এর আইটিসি গ্রিন সেন্টারে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল (Google AI Initiative)-এর সহযোগিতায় একটি ‘গ্লোবাল এআই সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-ভিত্তিক গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক মহলেও এই বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তর্ক-বিতর্ক চলেছে। সেই পরিস্থিতিতে ২৩০০ কোটির এই প্রস্তাব বাস্তবে রূপ পেলে তা সরকারের জন্য বড় সাফল্য হিসেবেই দেখা হবে।

সব মিলিয়ে পর্যটন, শিল্প, প্রযুক্তি এবং সবুজ শক্তিকে একসঙ্গে নিয়ে এগোনোর এই পরিকল্পনা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। এখন নজর একটাই—কাগজে-কলমের এই বিশাল পরিকল্পনা কত দ্রুত মাটিতে নামতে পারে।
কারণ ২৩০০ কোটির এই মেগা বিনিয়োগ যদি বাস্তবে রূপ পায়, তাহলে বাংলার শিল্প মানচিত্রে কি সত্যিই শুরু হবে এক নতুন যুগ? উত্তর লুকিয়ে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই।