৮৬ মিনিটে মাঠে নেমে ৮৮ মিনিটে গোল, মিকেল মেরিনোর জাদুতে বিশ্বকাপের শেষ চারে লা রোহা। লামিনে ইয়ামালের দুরন্ত প্রত্যাবর্তন, কুর্তুয়ার চোটও বদলে দিল ম্যাচের ভাগ্য।
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্বকাপ মানেই নাটক। বিশ্বকাপ মানেই আবেগ। আর সেই আবেগেরই আর এক অবিশ্বাস্য অধ্যায় লিখল স্পেন (Spain National Football Team)। শেষ মুহূর্তের নাটক, সুপার সাবের জাদু আর ৪০ বছরের অপেক্ষার অবসান—সব মিলিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্মরণীয় এক রাত উপহার দিল লা রোহা।
রুদ্ধশ্বাস কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম (Belgium National Football Team)-কে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026)-এর সেমিফাইনালে উঠে গেল স্পেন। এবার তাদের সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ—কিলিয়ান এমবাপের (Kylian Mbappé) ফ্রান্স।
এই জয়ের গুরুত্ব শুধু সেমিফাইনালের টিকিটেই সীমাবদ্ধ নয়। স্পেন ঘুচিয়ে দিল চার দশকের এক তীব্র যন্ত্রণা। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ঠিক এই বেলজিয়ামের কাছেই কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল স্পেনকে। সেই ক্ষত এত বছর পর অবশেষে ভরাট হল।
ম্যাচ শুরুর আগেই উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় দুই দল মুখোমুখি হওয়ায় স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। প্রায় ৭১ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে গ্যালারিতে দেখা গেল একাধিক আন্তর্জাতিক তারকাকেও। ফুটবলের এই মহারণ যেন মাঠের পাশাপাশি গ্যালারিতেও ছিল সমান জমজমাট।
শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে স্পেন। চোট কাটিয়ে দলে ফেরা লামিনে ইয়ামাল (Lamine Yamal)-কে নিয়ে সমালোচনা কম ছিল না। অনেকে প্রশ্ন তুলছিলেন তাঁর ফর্ম নিয়ে। কিন্তু বড় ম্যাচেই নিজের ছন্দ ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন স্পেনের এই তরুণ তারকা।
বারবার ডান দিক দিয়ে উঠে এসে বেলজিয়ামের রক্ষণকে চাপে ফেলছিলেন ইয়ামাল। তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং পাসিং বারবার প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে অস্বস্তি তৈরি করে।
৩০ মিনিটে স্পেনের চাপের ফল মিলল। দানি অলমো (Dani Olmo)-র শক্তিশালী শট প্রথমে রুখে দেন থিবো কুর্তুয়া (Thibaut Courtois)। কিন্তু বল ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি বেলজিয়ামের গোলরক্ষক। সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি ফাবিয়ান রুইজ (Fabián Ruiz)। ফিরতি বলে জোরালো শটে স্পেনকে ১-০ এগিয়ে দেন তিনি।
গোল খাওয়ার পরই ছন্দ বদলে ফেলে বেলজিয়াম। কেভিন ডি ব্রুইনে (Kevin De Bruyne) মাঝমাঠ থেকে একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকেন। তারই ফল মেলে ৪১ মিনিটে। দুর্দান্ত হেডে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান চার্লস ডি ক্যাতেলেয়ার (Charles De Ketelaere)। এই টুর্নামেন্টে প্রথমবার গোল হজম করল স্পেনের রক্ষণভাগ।
বিরতির পর ম্যাচ আরও জমে ওঠে। দুই দলই একের পর এক আক্রমণ চালালেও গোলের দেখা মিলছিল না। কখনও স্পেন, কখনও বেলজিয়াম—দুই প্রান্তেই উত্তেজনা বাড়ছিল প্রতি মুহূর্তে।
৭২ মিনিটে বড় ধাক্কা খায় বেলজিয়াম। ঊরুর চোটে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন অভিজ্ঞ গোলরক্ষক কুর্তুয়া। তাঁর জায়গায় নামেন সিন ল্যামেনস (Senne Lammens)। ম্যাচের মোড় ঘোরার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই পরিবর্তন।
অন্যদিকে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে (Luis de la Fuente) আবারও নিজের কৌশল দিয়ে সবাইকে চমকে দেন। ৮৬ মিনিটে মাঠে নামান মিকেল মেরিনো (Mikel Merino)-কে। এর আগের ম্যাচেও পরিবর্ত হিসেবে নেমে শেষ মুহূর্তে গোল করেছিলেন তিনি। এবারও যেন একই চিত্রনাট্য।
৮৮ মিনিটে স্পেনের আক্রমণ থেকে প্রথম শটটি রুখে দেন ল্যামেনস। কিন্তু বল তাঁর হাত ফসকে সামনে চলে আসে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন মেরিনো। কোনও ভুল না করে বল জড়িয়ে দেন জালে। মুহূর্তের মধ্যে স্টেডিয়াম জুড়ে শুরু হয় স্পেন সমর্থকদের উচ্ছ্বাস।
এখন স্প্যানিশ ফুটবলে নতুন নাম—‘সুপার সাব’ মিকেল মেরিনো। টানা দুই নকআউট ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়া সহজ কাজ নয়। কিন্তু সেটাই করে দেখাচ্ছেন এই মিডফিল্ডার।
সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায় গ্যালারিতে। ছেলের খেলা দেখতে এসেছিলেন মেরিনোর বাবা ও মা। দু’জনের গায়েই ছিল ছেলের ৬ নম্বর জার্সি। শেষ বাঁশি বাজার পর তাঁদের চোখেমুখে গর্ব, আনন্দ আর আবেগের মিশেল ফুটে ওঠে। সেই দৃশ্যও সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
এই জয়ের সঙ্গে আরও একটি বড় রেকর্ড গড়ল স্পেন। টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার নজির আরও দীর্ঘ করল লা রোহা। একই সঙ্গে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল তারা। এর আগে ২০১০ সালে শেষ চারে উঠে শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন।

এবার সামনে আরও বড় পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স, নেতৃত্বে রয়েছেন বিধ্বংসী ফর্মে থাকা এমবাপে। ইউরোপের দুই ফুটবল পরাশক্তির এই লড়াই ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ম্যাচগুলির একটি হয়ে উঠেছে।
স্পেন কি ২০১০ সালের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে আবারও বিশ্বকাপ জয়ের পথে আরও এক ধাপ এগোবে? নাকি এমবাপের ফ্রান্স থামিয়ে দেবে লা রোহার স্বপ্ন? সেই উত্তর জানার অপেক্ষায় এখন গোটা ফুটবল বিশ্ব।