সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“ডিভিসি আমাদের না জানিয়ে হঠাৎ করে জল ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে বন্যায় ঘরবাড়ি, চাষের জমি সবই ভেসে যাচ্ছে। এই কারণে রাজ্যের প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। যার কাজ করার কথা, সে নিজের দায়িত্ব নিচ্ছে না। আর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।” এভাবেই মঙ্গলবার রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও ডিভিসি-র বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
হলদিয়া বন্দর এবং কলকাতা বন্দরের বিষয়ে বলেন মুখ্যমন্ত্রী, “পলি জমে গিয়েছে, ড্রেজিং হয় না। জল ধরার ক্ষমতা অনেকটাই কমে গিয়েছে। এক লক্ষ কিউসেক জল ধরে, অথচ ডিভিসি ছেড়ে দিচ্ছে চার লক্ষ কিউসেক। তার চাপে ভেঙে পড়ছে কৃষক, সাধারণ মানুষ। অথচ কেন্দ্র কিছুই করছে না।”
রাজ্য ও কেন্দ্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মমতা। বলেন,”পরিবেশ দূষণ একটা বড় সমস্যা। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশ এবং বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে এর বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে। কেন্দ্র এখন স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন করছে, ফেডারেল কাঠামোও বদলাচ্ছে। অথচ রাজ্যগুলোর নিজস্ব নীতি নেওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন,”রাজস্থান আর গুজরাতে বন্দর থাকলেও সেখানেও ড্রেজিং হয় না। কিন্তু আমাদের এখানে সমস্যা হলে কেন্দ্র কিছুই করে না। রুল তৈরি করার অধিকার রাজ্যের আছে, কেন্দ্র শুধু গাইডলাইন দিতে পারে। সেই বিষয়টা ভুলে গেলে চলবে না।”
বন্যাবিধ্বস্ত ঘাটালবাসীদের একপ্রকার বরাভয় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। কক্ষে দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, “আমরা ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান করছি। একটু সময় লাগবে এতবড় প্রজেক্ট করতে, কিন্তু আমরাই করব। কেন্দ্র সরকার এক পয়সাও দেয়নি। আমরা নিজেরাই এই প্রজেক্ট করছি। এই প্রজেক্ট করতে গিয়ে জমি নিয়ে যদি কোনও সমস্যা হয় তাহলে প্রজেক্ট একটু ঘুরিয়ে দিতে অনুরোধ করব, যাতে সাধারণ মানুষের কোনও অসুবিধা না হয়।”
‘জল ধরো, জল ভরো’ প্রকল্পের সাফল্য তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। পরিবেশ রক্ষা নিয়ে রাজ্যের নিজস্ব উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরাই প্রথম রাজ্য, যারা ২০১১ সালের আগেই পরিবেশ রক্ষায় ম্যানিফেস্টো তৈরি করেছিলাম। ইতিমধ্যেই রাজ্যে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ ‘জল ধরো জল ভরো’ প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। পরিবেশ বাঁচাতে হলে জল সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও জোর দিতে হবে।”

আহত বিধানসভা কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ
মঙ্গলবার রাজ্য বিধানসভার অধিবেশনে যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার অধিবেশনে বিজেপি বিধায়কদের হাতে আক্রান্ত হওয়া আহত বিধানসভা কর্মীদের সঙ্গে দেখা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। তারা যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন সেই কামনা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অধিবেশনের ভিতর যেভাবে কর্মীদের গায়ে হাত তাওয়া হয়েছে তা খুবই লজ্জাজনক ঘটনা। বিরোধীদলের বিধায়কদের এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানান মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমি শুনেছি বিধানসভার কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে নাকি এফআইআর করা হয়েছে। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় বিধায়কদের অনেকের বেতন কাটা হয়েছিল। আমি বলছি না যে আপনি বেতন কাটুন। কিন্তু আপনি আইনজীবী মানুষ, আইন অনেক বেশি জানেন। আপনি নিশ্চয়ই একটা কিছু ব্যবস্থা করবেন। যারা আহত হয়েছেন আমি ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব তারা যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠেন।”
মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতে উঠে এল যুদ্ধ প্রসঙ্গ। যার প্রেক্ষিতে রাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “পররাষ্ট্র কেন্দ্রের অধীনে, এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারি না, তবুও শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক পথে যুদ্ধ পরিস্থিতি ঠেকানো উচিত। এই পৃথিবী একটাই দেশ, শুধু কথা আলাদা, ভাষা আলাদা।”
তবে পররাষ্ট্রের বিষয়ে তিনি যে কোনও মন্তব্য করতে পারেন না, তা ফের স্পষ্ট করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি দেশকে কোনও নির্দেশ দিতে পারি না, আমি শুধু আবেদন করতে পারি। দেশের পররাষ্ট্র নীতি দেশের সরকারই ঠিক করবে।”
তা সত্ত্বেও যুদ্ধ প্রসঙ্গে কেন এই বিবৃতি তার ব্যাখ্যা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমি শুধু অনুরোধ করছি, কূটনৈতিকভাবে আমাদের এমন কোনও পদক্ষেপ করা উচিৎ যাতে এই যুদ্ধ থেমে যায়, পৃথিবীতে শান্তি ফিরুক। দূষণমুক্ত হোক পৃথিবী।”
বছর তিন আগে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষের সময়ও মুখ্যমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সেবারও কেন্দ্রের পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্তের উপরই আস্থা রেখেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ভারত-পাক সংঘর্ষে তো পুরোপুরিই কেন্দ্রের পাশে থেকে একতার বার্তা দেন। এবার মধ্যপ্রাচ্যে ভয়ংকর যুদ্ধ বন্ধেও কেন্দ্রের যথাযথ পদক্ষেপের কথা বললেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।