প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
ভারতে স্বাস্থ্যবীমা খাত আজ দেশের অন্যতম বড় একটি বিতর্কিত ক্ষেত্র। মানুষ ভাবে স্বাস্থ্যবীমা থাকলে অন্তত চিকিৎসার খরচ মেটানো সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—প্রিমিয়াম নিয়মিত দেওয়ার পরেও প্রয়োজনের সময় রোগী ও পরিবারের হাতে যথাযথ টাকা পৌঁছচ্ছে না। ফলে স্বাস্থ্যবীমা অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হচ্ছে এক ধরনের প্রতারণায়।
বাস্তব উদাহরণে স্বাস্থ্যবীমার সংকট
প্রথম উদাহরণ:
মুম্বইয়ের এক প্রখ্যাত হাসপাতালে মায়েলয়েড লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত এক রোগীর বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট প্রয়োজন ছিল। বিমা সংস্থা প্রথমে ২৫ লক্ষ টাকার একটি প্যাকেজ অনুমোদন করলেও, আসল খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৬২ লক্ষ টাকারও বেশি। পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে অতিরিক্ত অনুমোদন চাইলে বিমা সংস্থা অস্বীকার করে। পরিবারটি বহু বছর ধরে প্রায় ২.৪০ কোটি টাকার কভার পলিসি চালিয়ে আসলেও জরুরি সময়ে সম্পূর্ণ খরচ মেটাতে বিমা কোম্পানি পিছিয়ে যায়।
দ্বিতীয় উদাহরণ:
কোয়েম্বাটুরের এ. রবি নামের একজন গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত প্রিমিয়াম দিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের বিল প্রায় ৪ লক্ষ টাকা দাঁড়ায়। বিমা সংস্থা প্রথমে কিছু টাকা দিলেও পরবর্তীতে ২.১৭ লক্ষ টাকার দাবি বাতিল করে। তিনি ভোক্তা আদালতে মামলা করেন এবং আদালত জানিয়ে দেয় বিমা সংস্থা অন্যায় করেছে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানিকে কেবল বাকি টাকাই নয়, ক্ষতিপূরণও দিতে হয়।
এমন উদাহরণ ভারতের প্রতিটি রাজ্যে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ ও গাজিয়াবাদের মতো জায়গাতেও রোগীরা একই অভিজ্ঞতার শিকার।
কেন এমন হয়?
1. চুক্তির অস্পষ্টতা:
বেশিরভাগ সংস্থা দাবি করে যে বহু হাসপাতালের সাথে তাদের চুক্তি আছে। কিন্তু রোগী ভর্তি হওয়ার পর জানা যায় বাস্তবে অনেক হাসপাতাল ক্যাশলেস সার্ভিস দেয় না।
2. ক্লেম বাতিলের প্রবণতা:
প্রায়ই দেখা যায় পলিসিতে লেখা থাকা সত্ত্বেও নানা অজুহাতে বিমা কোম্পানি ক্লেম বাতিল করে।
3. চিকিৎসার আসল খরচ লুকানো:
গ্রাহককে আগে থেকে পরিষ্কার করে জানানো হয় না কোন খরচ কতটা পর্যন্ত কভার হবে। ফলে আসল সময়ে ভয়াবহ সমস্যায় পড়তে হয়।

মেডিক্যাল লস রেসিও: ভারত বনাম বিদেশ
বিদেশে স্বাস্থ্যবীমা কোম্পানিগুলিকে বাধ্যতামূলকভাবে একটি নির্দিষ্ট শতাংশ গ্রাহকের চিকিৎসায় খরচ করতে হয়। যেমন—
আমেরিকা, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে কমপক্ষে ৮০%–৮৫% প্রিমিয়াম সরাসরি চিকিৎসার খরচে ব্যয় করতে হয়।
যদি কোম্পানি সেই পরিমাণ খরচ না করে, তবে অব্যবহৃত অর্থ গ্রাহককে ফেরত দিতে হয়।
ভারতে এ ধরনের কোনো বাধ্যতামূলক আইন নেই। ফলে বিমা কোম্পানিগুলি প্রায় ৩০%–৩৫% প্রিমিয়াম খরচ করে ফেলে প্রশাসনিক খরচ, মার্কেটিং ও কমিশনে। প্রকৃত চিকিৎসায় ব্যয় হয় ৬৫% বা তারও কম।
সরকারি স্কিম বনাম বেসরকারি বিমা
অনেকে প্রশ্ন করেন—যদি স্বাস্থ্যসাথী বা আয়ুষ্মান ভারত স্কিম থাকে তবে বেসরকারি বিমা কেন প্রয়োজন?
উত্তর হলো—সরকারি স্কিমগুলিতেও দুর্নীতি আছে।
২০২৫ সালের জুন মাসে উত্তরপ্রদেশের লখনউতে আয়ুষ্মান ভারত ও জন আরোগ্য যোজনার আওতায় প্রায় ১০ কোটি টাকার জালিয়াতি ধরা পড়ে। সেখানে বেসরকারি হাসপাতাল এবং সরকারি অফিসারদের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে।
পশ্চিমবঙ্গেও অনেক বেসরকারি হাসপাতাল স্বাস্থ্যসাথী কার্ড গ্রহণ করে না। ফলে রোগীদের সরকারি হাসপাতালে ভরসা করতে হয় অথবা মোটা খরচ দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হয়।
জিএসটি বাতিল ও প্রিমিয়ামের বাস্তব চিত্র
সম্প্রতি স্বাস্থ্যবীমার উপর থেকে জিএসটি বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন এতে খরচ কমবে। কিন্তু রিপোর্ট বলছে—প্রিমিয়ামের ওপর খরচ বাড়ছে বছরে ২০–২৫% হারে। আবার জিএসটি বাদ দেওয়ায় মোট প্রিমিয়ামে ৩–৫% বাড়তি চাপ আসতে পারে। ফলে খরচ খুব একটা কমার সম্ভাবনা নেই।
সমাধান কী?
1. কড়া আইন:
ভারতে জরুরি ভিত্তিতে মেডিক্যাল লস রেসিও আইন চালু করতে হবে। ন্যূনতম ৮০% প্রিমিয়াম চিকিৎসার খরচে ব্যয় নিশ্চিত করা উচিত।
2. স্বচ্ছতা:
বিমা সংস্থাগুলিকে বাধ্যতামূলকভাবে সমস্ত কভারেজ ও সীমাবদ্ধতা সহজ ভাষায় গ্রাহককে জানাতে হবে।
3. ক্যাশলেস সার্ভিসের নিশ্চয়তা:
যে হাসপাতালগুলির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ক্যাশলেস সুবিধা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
4. গ্রাহক সচেতনতা:
গ্রাহকরা যেন সঠিক তথ্য জানেন এবং প্রয়োজনে ভোক্তা আদালতের দ্বারস্থ হতে দ্বিধা না করেন।
ভারতে স্বাস্থ্যবীমা খাত দিন দিন আকারে বড় হলেও এর ভেতরের দুর্নীতি ও অনিয়ম ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মানুষ প্রিমিয়াম দিয়ে আশা করে বিপদের সময় সহায়তা পাবে, কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় তা হয় না। তাই প্রয়োজন কঠোর নিয়মকানুন, স্বচ্ছতা এবং গ্রাহক সুরক্ষার ব্যবস্থা। স্বাস্থ্যবীমা প্রকৃত অর্থে মানুষের জন্য সহায়ক হবে, যদি এটি ব্যবসায়িক মুনাফার বাইরে গিয়ে প্রকৃত চিকিৎসা সেবায় ব্যবহৃত হয়।