সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
দুর্গাপুরের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রীকে গণধর্ষণের যে অভিযোগ উঠেছে সেই ঘটনার তদন্তে নির্যাতিতার সেই রাতের সহপাঠী এবং এফআইআরে নাম থাকা দুজনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে গেল আসানসোল দুর্গাপুর কমিশনারেটের পুলিশ। দুর্গাপুরের ডিসি ইস্ট অভিষেক গুপ্তার নেতৃত্বে আজ গোয়েন্দারা সেই জঙ্গলে নিয়ে যান তিনজনকে। সেই রাতে ঠিক কি কি হয়েছিল এখনো পর্যন্ত নির্যাতিতা তার সহপাঠী এবং যে পাঁচ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের থেকে পাওয়া বয়ানের ভিত্তিতে গোটা ঘটনার পুনর্নির্মাণ করে পুলিশ। ধৃতদের রাতভর জেরা করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে ২ জনকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ধৃতদের বাড়ি থেকেও সূত্রের খোঁজ চালাচ্ছে পুলিশ। ডিসিপি অভিষেক গুপ্তার নেতৃত্বে একটা বড় টিম দুর্গাপুরের মেডিক্যাল কলেজে পিছনের জঙ্গলে যায়। হাসপাতালের বেরনোর পথ থেকে যে রাস্তা ধরে নির্যাতিতা ও তাঁর সহপাঠী গিয়েছিলেন, সেই রাস্তাও খতিয়ে দেখা হয়। তারপরই নিয়ে আসা হয় নির্যাতিতার সহপাঠীকেও।
ঘটনার রাতে ধৃতদের পরনে থাকা পোশাকও উদ্ধার করেছে পুলিশ। অভিযুক্তদের বয়ানের সঙ্গে সহপাঠীর বয়ান মিলিয়ে দেখা হবে। দু’জনকে দিয়ে আলাদা আলাদা করে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হয় বলে জানা গিয়েছে। সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে প্লেস অফ অকারেন্স বা অকুস্থল খতিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা।
ইতিমধ্যেই নির্যাতিতার প্রাথমিক মেডিক্যাল রিপোর্টে ঘটনার রাতে যৌন সংসর্গের ইঙ্গিত মিলেছে। রিপোর্টে চিকিৎসকরা উল্লেখ করেছেন, যৌনাঙ্গে ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। যৌনাঙ্গের ভিতরের চামড়া ছিঁড়ে গিয়েছে। তবে তা ধর্ষণের জন্য নাকি গণধর্ষণের জন্য অথবা অন্য কোন কারণে তা খতিয়ে দেখার জন্য ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ডিএনএ রিপোর্ট প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
সোমবারই অভিযোগ অনুযায়ী গ্রেফতারি সম্পন্ন করে পুলিশ। অভিযুক্তদের আদালতে পেশ করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। অন্যদিকে শনিবার থেকেই পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে রাখা হয়েছে নির্যাতিতার সঙ্গীকে। মঙ্গলবার সেই ঘটনাস্থলে পুণর্নির্মাণের জন্য যায় পুলিশ। নেতৃত্ব দেন ডিসিপি অভিষেক গুপ্তা। পরাণগঞ্জের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয় নির্যাতিতার সঙ্গী ও এক অভিযুক্তকে। মিলিয়ে দেখা হয় নির্যাতিতার অভিযোগের সঙ্গে ধৃত ও আটকদের বয়ান।
পাশাপাশি তদন্তের প্রমাণ সংগ্রহে মঙ্গলবারই দুর্গাপুরের বিজড়া গ্রামে যায় পুলিশের আরেকটি দল। গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় ধৃত শেখ রেজাউদ্দিন ও শেখ নাসিরুদ্দিনকে। তাদেরকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় ও কিছু পোশাক সংগ্রহ করা হয়। গণধর্ষণের অভিযোগে এই পোশাক বড় ভূমিকা নিতে পারে বলেই আশা গোয়েন্দাদের।
যদিও ঘটনার চারদিন পরে এখনও মূল ঘটনা নিয়ে একাধিক জটিলতা থেকে গিয়েছে। জানা গিয়েছে, ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে পুলিশে ধরিয়ে দেন তারই বোন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত শফিক শেখের বোন রোজিনা শেখকে সোমবার দুর্গাপুরের আণ্ডাল ব্রিজের নীচে তাকে ধরিয়ে দিতে সহায়তা করেছিলেন। এই বিষয়ে রেজিনা বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম ভাই আইনের মুখোমুখি হোক। তার জন্য আমাদের পরিবারের লজ্জার ভাগিদার হওয়া উচিত নয়।’ এদিকে যে শেখ নাসিরুদ্দিনের মোটরসাইকেলে করে অপরাধীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়, তাকেও ধরেছে পুলিশ। ধৃত অন্য তিনজন হল – রিয়াজউদ্দিন (কলেজের প্রাক্তন নিরাপত্তারক্ষী), অপু বারুই এবং ফিরদৌস শেখ।
নির্যাতিতা তরুণী ওড়িশার জলেশ্বরের বাসিন্দা। নির্যাতিতার দায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর রাত সাড়ে আটটা নাগাদ ওই পড়ুয়া সহপাঠীর সঙ্গে কলেজের বাইরে খেতে বেরিয়েছিলেন। সেই সময় কয়েকজন যুবক ওই তরুণীর পথ আটকায় এবং জোর করে হাসপাতালের পিছনের দিকে থাকা একটি জঙ্গলে নিয়ে যায়। এদিকে দুষ্কৃতীদের তাড়া খেয়ে তরুণীর সঙ্গে থাকা বন্ধুটি পালিয়ে যান বলে জানা যায়। এদিকে গণধর্ষণ করার পর ডাক্তারি পড়ুয়ার মোবাইলটি ছিনিয়ে নেয় দুষ্কৃতীরা। ৩ হাজার টাকাও নাকি চাওয়া হয়েছিল সেই তরুণীর থেকে। তা না পেয়ে অভিযুক্তরা নাকি নির্যাতিতাকে মারধরও করেছিল। এই আবহে নিজের অভিযোগপত্রে নির্যাতিতা দাবি করেন, ৫ জন মিলে তাঁকে ধর্ষণ করেছিল।