চুলকাটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার, দীর্ঘ চিকিৎসার পর ঝড়খালিতে ঠাঁই—হঠাৎ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বাঘিনীর
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
ঝড়খালি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: একের পর এক লড়াই পেরিয়েও শেষরক্ষা হল না। সুন্দরবনের [Sundarbans] জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা সেই ১৩ বছরের বাঘিনীর মৃত্যু হল ঝড়খালি রেসকিউ সেন্টারে [Jharkhali Rescue Centre]। সোমবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মৃত্যু হয় তার। ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে এলাকায়।
বন দফতর সূত্রে খবর, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সুন্দরবনের চুলকাটি জঙ্গল [Chultakati Forest] থেকে অসুস্থ অবস্থায় বাঘিনীটিকে উদ্ধার করেছিলেন বনকর্মীরা। শারীরিক সমস্যার কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতেও তার যথেষ্ট সমস্যা হচ্ছিল।
উদ্ধারের পর শুরু হয় চিকিৎসা। প্রথমে বাঘিনীটিকে নিয়ে যাওয়া হয় আলিপুর চিড়িয়াখানায় [Alipore Zoo]। সেখানে প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস ধরে চলে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ। ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তাকে ঝড়খালি রেসকিউ সেন্টারে স্থানান্তরিত করা হয়।
সেখানেই গত কয়েক মাস ধরে ছিল বাঘিনীটি। কিন্তু সোমবার সকালে আচমকাই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করেন রেসকিউ সেন্টারের কর্মীরা এবং চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত আর সাড়া দেয়নি বাঘিনীটি। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়।
চিকিৎসা শুরু হলেও বাঁচানো গেল না
বন দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, বাঘিনীটি আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। খবর পাওয়ার পরই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চলাকালীনই মৃত্যু হয় তার।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে নিয়ম মেনে বাঘিনীর ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সাধারণভাবে সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের [Royal Bengal Tiger] আয়ু প্রায় ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে হতে পারে। ফলে ১৩ বছর বয়সি এই বাঘিনী ইতিমধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক বয়সের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।
তবে তার মৃত্যু নিছক একটি বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা নয়। কারণ, এই বাঘিনীকে একসময় সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে দীর্ঘ চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। সেই লড়াইয়ের পর ঝড়খালিতে তার মৃত্যু স্থানীয়দের কাছেও যথেষ্ট আবেগের হয়ে উঠেছে।
গত বছরও মৃত্যু হয়েছিল আরও এক বাঘের
ঝড়খালি রেসকিউ সেন্টারে বাঘের মৃত্যু অবশ্য এই প্রথম নয়। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বছরও এখানে একটি বাঘের মৃত্যু হয়েছিল। সেই বাঘটির মৃত্যু হয়েছিল বয়সজনিত স্বাভাবিক কারণে।
তবে এবার ১৩ বছরের বাঘিনীর আকস্মিক অসুস্থতা এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু নতুন করে আলোচনায় এনেছে রেসকিউ সেন্টারের বন্যপ্রাণী পরিচর্যার বিষয়টিও।
বর্তমানে ঝড়খালি রেসকিউ সেন্টারে একটি বাঘ রয়েছে। আগে সেখানে একটি বাঘ ও একটি বাঘিনী ছিল। বাঘিনীটির মৃত্যুর পর এখন একমাত্র বাঘটিই রয়েছে সেন্টারে।
শোকের ছায়া ঝড়খালিতে
বাঘিনীটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঝড়খালি ও সংলগ্ন এলাকায় নেমে আসে বিষাদের আবহ। সুন্দরবনের সঙ্গে এই এলাকার মানুষের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জঙ্গলের বাঘকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আবেগও তাই আলাদা।

চুলকাটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়ার পর চিকিৎসা, সুস্থ হয়ে ওঠা এবং ঝড়খালি রেসকিউ সেন্টারে নতুন করে আশ্রয়—দীর্ঘ এই যাত্রার পর সোমবার রাতে থেমে গেল ১৩ বছরের বাঘিনীর জীবন।
এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকেই নজর বন দফতরের। হঠাৎ ঠিক কী কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বাঘিনীটি, আর তার মৃত্যুর নেপথ্যে কোনও শারীরিক জটিলতা ছিল কি না—উত্তর মিলবে ময়নাতদন্তের রিপোর্টেই।