সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস দফতর বিধান ভবনে তাণ্ডব চালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। পাঁচ দিন পর সেই তাণ্ডবকারী বিজেপি নেতা রাকেশ সিংকে গ্রেফতার করল পুলিস। ট্যাংরা এলাকায় এক অভিজাত আবাসনে এক আত্মীয়ের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন রাকেশ। টানা পাঁচ দিন লুকিয়ে থাকলেও পুলিসের গাড়িতে ওঠার সময়ে রাকেশের হুংকার, ‘কলকাতা পুলিস হুঁশিয়ার। রাকেশ সিং কখনও ভয় পায়নি, ভয় পাবেও না।’
গত শুক্রবার বেলা ১১ টা নাগাদ বিধান ভবন-এ দলল নিয়ে এসে তাণ্ডব চালান রাকেশ সিং। সে সময় দফতরে কেউ উপস্থিত ছিলেন না। অভিযোগ, সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কংগ্রেস দফতরে ভাঙচুর চালানো হয়। গেটের বাইরে থাকা রাহুল গান্ধীর ছবিতে কালি লাগানো হয়। অন্যান্য নেতাদের ছবি থেকে শুরু করে কংগ্রেসের দলীয় পতাকা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ, বিজেপি নেতা রাকেশ সিংহের নেতৃত্বে একদল সমর্থক ঢুকে একাজ করেন। এরপর সেদিনই রাকেশের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয় এন্টালি থানায়। অস্ত্র আইনের একাধিক ধারায় মামলা রজু হয়।
এর আগে চার জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে ছিলেন রাকেশের পুত্র শিবম সিংহ। এ ছাড়াও রাকেশের তিন ঘনিষ্ঠ বিজয়প্রসাদ ধানুক, সন্তোষকুমার রাজভর এবং দিব্যেন্দু সামন্ত। এই ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন রাকেশ। যদিও পুত্রের গ্রেফতারির পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়ে তিনি বলেন, তাঁকে গ্রেফতার করতে না পেরে তাঁর পুত্রকে গ্রেফতার করে হেনস্থা করা হচ্ছে। এমনকি তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা পুত্রের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদেরও হেনস্থা করেছে পুলিশ বলে অভিযোগ তাঁর। সরাসরি কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মাকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি।
রাকেশের নেতৃত্বে কলকাতায় প্রদেশ কংগ্রেসের দপ্তরে রাহুল গান্ধী-সহ অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের ছবি এবং দলীয় পতাকা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর থেকেই রাকেশ সিং পলাতক ছিলেন। পুলিশ তাকে খুঁজতে গিয়ে তার বাড়িতে হানা দেয়। কিন্তু রাকেশের খোঁজ মেলেনি। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রাকেশের খোঁজে তদন্ত চলাকালীনই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। পুলিশ জানতে পারে, রাকেশ কলকাতায় একটি গাড়িতে করে ঘোরাফেরা করছেন। ওই গাড়িটি শিবমের নামে রেজিস্টার্ড। কংগ্রেস অফিসে হামলার সময় রাকেশ এই গাড়িটিই ব্যবহার করেছিলেন বলে দাবি পুলিশের। এই বিষয়ে শিবমকে জেরা করলে তাঁর বক্তব্যে অসঙ্গতি ধরা পড়ে এবং তিনি বাবার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। গতকাল গভীর রাতে রাকেশ সিংকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিসের অ্যান্টি রাউডি স্কোয়াড। তার বিরুদ্ধে ১১টি ধারায় অভিযোগ করা হয়েছে।
বুধবার দুপুরে শিয়ালদা কোর্টে তোলা হয় রাকেশকে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে পুলিশ আদালত চত্বরে পৌঁছতেই তুমুল উত্তেজনা ছড়ায়। দলীয় পতাকা হাতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন কংগ্রেসের সমর্থকরা। বিজেপি সমর্থকরা হাজির হন পতাকা দলীয় ছাড়াই। গাড়ির ভিতর থেকে দলীয় সমর্থকদের দেখে দুই হাত তোলেন রাকেশ। আর এর পরই পরিস্থিতি তেতে ওঠে। বিজেপি-র তরফে ‘মোদি’, ‘মোদি’ স্লোগান তোলা হয়। অভিযোগ করা হয়, এক প্যাকেট করে বিরিয়ানির লোভে জমায়েত করছেন কংগ্রেস সমর্থকরা। এর পাল্টা কংগ্রেসের তরফে তোলা হয় ‘চোর’ স্লোগান। কংগ্রেস সমর্থকরা একযোগে বলতে থাকেন, ‘চোর চোর, ভোট চোর, গদ্দি ছোড়’। দুই তরফেই ব্যারিকেড ঠেলে এগনোর চেষ্টা হয়। পুলিশ আটকাতে গেলেও একটা সময় পর দুই দিকের ব্যারিকেডই ভেঙে ফেলা হয়।
এই ঘটনা বিজেপিকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই ঘটনার নিন্দা করে বলেছেন, কোনও রাজনৈতিক দলের পতাকায় আগুন লাগানোকে বিজেপি সমর্থন করে না। রাকেশের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব।
প্রসঙ্গত, ঘটনার সূত্রপাত ২৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন ‘ভোটার অধিকার যাত্রা’র অংশ হিসেবে বিহারের দ্বারভাঙা থেকে মুজফ্ফরপুর যাচ্ছিলেন রাহুল, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী, তেজস্বী যাদবেরা। অভিযোগ, দ্বারভাঙায় কংগ্রেসের একটি মঞ্চ থেকে বছর কুড়ির এক তরুণ প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং তাঁর প্রয়াত মাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তার জেরেই কলকাতায় কংগ্রেসের সদর দফতরে হামলা চালানো হয় বলেই অভিযোগ উঠেছে।